Natun Kagoj

ঢাকা, বুধবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী

দালালী কী হালাল পেশা নাকী দুর্নীতি!

আপডেট: ০৬ মে ২০১৭ | ১৪:২৫

 

তৌফিক আহমেদ

দালালের মাধ্যমে কোন কাজ করেনি বা দালালের খপ্পরে পরেনি এমন মানুষ খুব কমই আছেন!দালাল এক প্রকাশ্যগোপন পেশার আদি ও আধুনিক গোষ্ঠী যারা বিনা পুঁজিতে অধিক রুজির মালিক হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আইনের নাকের ডকায়।

প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই আপনি পাবেন দালাল এবং দালাল চক্রের কোন না কোন খবর। কোন খুশির খবর নয়। কেবলি হতাশা আর বঞ্চনার খবর। হয় দালালের খপ্পরে পরে কেউ সর্বশান্ত হয়েছে, কারো জীবন গিয়েছে, কেউ গলাকাটা পাসপোর্ট নিয়ে ধরা পরেছে।পাচার হয়েছে কারো মা, বোন। পাশাপাশি আরো সংবাদ শিরোনাম থাকে দালালদের উৎপাত বেড়েছে অমুক অফিসে, তমুক অফিসে দালালদের দৌড়াত্বের শেষ নেই, দালালদের হাতে জিম্মি সাধারণ মানুষ ইত্যাকার নানাবিধ সংবাদ। পাসপোর্ট অফিস থেকে ভূমি, ভূমি থেকে হাসপাতাল, হাসপাতাল থেকে কর্মসংস্থান ব্যুরো।সর্বশেষ গরুর হাটে গিয়ে দেখবেন এর চরম অবস্থা।এক কথায় সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দেশে এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে দালালের আনাগোনা নেই, উৎপাত নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু বরণ, কবর বা শেষ কৃত্যেও দালালদের দৌরাত্ব আজ সর্বত্র।কবরের জায়গা বরাদ্দ, দাফন কাফন, হসপিটাল থেকে লাশ হস্তান্তর, লাশ বহনের গাড়ী ভাড়া কোথায় নেই দালাল চক্র?জীবনে দালাল, জীবনান্তে দালাল, জীবনের পরেও দালাল।

পেশা হিসেবে যদিও কাগজে কলমে এরা কখনও দালাল শব্দটি ব্যবহার করে না। কেন করে না তা সহজেই অনুমেয়।দালালী করে অনেকেই অগাধ সম্পদের মালিক হলেও এর সামাজিক মর্যাদা নেই।তাই চটকদার নাম দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে তার আড়ালে দালালী ব্যবসা করে। অপরদিকে ছোটখাটো ছিচকে দালালরা প্রকাশ্যেই করে থাকে তাদের দালালী। ১০০ টাকা থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার রোজগেরে দালালও আছে। হাট বাজারে কেনা বেচা থেকে বিশাল নির্মান বা ক্রয় বিক্রয়ে দালালী প্রথা চালু আছে প্রাচীনকাল থেকেই। তাই এটি আপাত স্বীকৃত একটি পেশাও বটে।বিশেষ করে শেয়ার বাজারে ব্রোকারী হাউজ বা এজেন্ট এর কথাটি লোকের মুখে মুখে শোনা যায়। তবে দালালরা মানুষের কাছ থেকে কলাকৌশলে বেশি মুনাফা হাতিয়ে নেয় বলে এদেরকে কেউ ইতিবাচকভাবে গ্রহন করে না। ক্ষেত্র বিশেষে এদের ছাড়া কোন কাজই হয়না। আর এই চক্রটির উদ্ভবের ফলে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই জিম্মি হয়ে পরেছে। অধিকাংশ সরকারি অফিসেই দালাল ছাড়া বৈধ কাজও সহজে করানো যায় না।এতে লাভবান হচ্ছে, তিন পক্ষই।সংশ্ল্ষ্টি কর্মকর্তা দালাল ও সেবাগ্রহিতা কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্থ হন সেবা গ্রহিতারাই। অনেক সময় ১০০ টাকার ফি বা খরচ বাবদ কাজ ১০ হাজার টাকায়ও সমাধা হয় না।সৎভাবে উপার্জনশীলদের ক্ষেত্রে কত যে সমস্যা হয় এই টাকার যোগান দিতে। দালালরা বুঝেও বিবেচনা করে না মানুষের দৈন্য দশাকে।

‘‘অন্যান্য ধর্মসহ ইসলাম ধর্ম দালালদের স্বীকৃতিও দিয়েছে শর্ত সাপেক্ষে। যে ব্যক্তি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অপরের মাল কেনা বেচা করে দেয় তাকে দালাল বলে অভিহিত করা হয়। ইসলাম সকল অনৈতিকতা ও অসততাকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সুনির্দ্রিষ্ট এমন কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছে যে গুলো মেনে চলা হলে দালালদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা ইতিবাচক থাকত।‘‘

‘‘ইসলামের দৃষ্টিতে দালাল হল আজীরে মুশ্তারিক বা সময় মুক্ত শ্রমিক। অতএব, অন্যান্য শ্রমিকের মতই দালালী হালাল হওয়ার জন্য শর্ত হল, পারিশ্রমিক পূর্বেই নির্দ্রিষ্ট করে নিতে হবে। পারিশ্রমিক নির্দ্রষ্ট হওয়ার দু’টি পদ্ধতি। যথাঃ পরিমাণ নির্দ্রিষ্টি করা। যেমন, ছাবেদ রমিজের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল, সে রমিজকে জমি কিনে দেবে, বিনিময়ে রমিজ তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিবে। বেচা কেনা শেষে সেই পরিমান অর্থই বুঝে নিল।কেনা বেচার পর ছাবেদ কোন ছলনার আশ্রয় নিল না এবং রমিজকে ক্ষতিগ্রস্ত করলো না এটা ইসলাম অনুমোদন দেয় কিন্তু বিনিময় অনির্দিষ্ট রেখে বেচা-কেনায় সহযোগিতার চুক্তি করা হলে সেই চুক্তি ও বিনিময় সবই নাজায়েজ বা হারাম হবে। যেমন, করিম সাঈদকে বলল, আপনি আমার এই গাড়ি বিক্রি করে আমাকে দুই লাখ টাকা দিবেন। এর বেশি যত বেচতে পারবেন তা আপনার থাকবে। অথবা, যদি ক্রেতা বা বিক্রেতার কাছে অস্বচ্ছ রেখে কেনাবেচা করে নিজের ইচ্ছে মত উভয়ের কাছ থেকেই মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় দালাল তাহলে তা অবৈধ বা হারাম বলে বিবেচিত হবে। যা বর্তমানে চলছে। আগেকার দিনে শুধু কেনা বেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই দালালী প্রথা কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তা আজ বিস্তৃতি লাভ করেছে নানা শাখা প্রশাখায়।

অপরদিকে প্রনিধানযোগ্য সংজ্ঞানুযায়ী দুর্নীতি হচ্ছে ব্যাক্তি স্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, অর্থথ আত্মস্বাৎ, নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থথ লেনদেন, কেনাকাটায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অন্যের প্রাপ্য অধিকার হরণ ইত্যাদি। এক্ষেত্রে দালালী কোন পর্যায়ের দুর্নীতি তা বিশেষজ্ঞ বিচার্র্য।

অর্থ ও স্বার্থের বিনিময়ে দালালরা মানুষের কার্য উদ্ধার করে দেয়।কাজকে সহজ করে দেয়।আবার অন্যায় অনিয়মের মাধ্যমে অপরাধীদের রক্ষা করে, জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা, বিশাল সম্পদ হাসিল করে দেয়া, ভূয়া কাগজ পত্র, নকল দলিল, ব্যবসার লাইসেন্স, ঋণ অনুমোদন, সবই তারা করে।এখন সাধারণ ছাপোশা দালাল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দালালও আছে। এরা বিভিন্ন নামে পরিচিত। এজেন্ট, মিডিয়া, কন্সালটেন্ট, ব্রোকার হাউজ আরো সব বাহারী নামের প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে দালালেরা। ইদানিং দালালীর আরেক নাম তদবীর পার্টি।এর মাধ্যমে, নিয়োগ, বদলী, প্রমোশন এর কাজ করা হয়।বছরে বিশাল অংকের টাকা লেনদেন হয় দালালীর মাধ্যমে। পিয়ন থেকে শুরু করে সের্বাচ্চ কর্তা পর্যন্ত ভাগ বন্টন হয় এই টাকা। আর গোপনে কেনাবেচার ক্ষেত্রে সরকার রাজস্য হারায় লাখ লাখ টাকার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একজন দালালী সম্পর্ক এভাবে বলেন, দালালীতে বেশী জ্ঞান লাগে, আমাদের দেশটা এখন সম্পূর্ণভাবেই বিভিন্ন পণ্যের দালালদের হাতে, একসময়ের পাটের দালাল, বীমার দালাল, কোর্ট কাচারী , পুলিশের দালাল, নেশার দালাল, ভূমির দালাল, তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদের দালাল, লগ্নী পুঁজির দালাল ইত্যাকার দালালীই এখন নিত্য কর্ম ও ধর্ম হয়ে উঠেছে এই জনপদের শিক্ষিত মানব কুলের। এই সমাজ ও জনপদে দালালীর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য আলাদা কোন ফ্যাকাল্টির প্রয়োজন হয় না। একজন বলেন, হালে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে অপদালালীর সংস্কৃতি যা সবচেয়ে ভয়াবহ দালালী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। চাটুকারিতা, তৈল মর্দন আর তোষামোদ নামের দালালীপনা অপরাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটায়।

মানুষের ভীড়ে ভাল মানুষ সেজে, মানুষকে ঠকানো দালাল নামের মানুষগুলোর এইসব অপতৎপরতা কি কেউ রোধ করতে পারবে না কোনদিন? এসব প্রশ্ন কি অবান্তরই থেকে যাবে প্রকাশ্য পোপন হয়ে?

প্রশ্ন আরো আছে- অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই এই পেশার প্রসার ঘটেছে। এরাই মূলত দালালদের বড় রক্ষাকবচ। ছোটখাটো কিছু দালালের বিচার কালেভদ্রে হয়তো হয় কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তির বিধান হয়তো নেই প্রচলিত আইনে।তাইতো এদের দৌরাত্ব এতটুকুও কসম না!

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, গরুর হাট থেকে দালালী যখন উঠে আসে সাংবাদিকতায়, বিচারালয়ে, রাজনীতি আর ধর্মশালায় কিংবা মহৎ সব পেশা আর প্রতিষ্ঠানে তখন হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না।মানুষ নীতি আর নৈতিকতা হারিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে যখন গা ভাসায় তখন যত শুদ্ধতা আর শুদ্ধাচারের বাণীই প্রচার করা হোক না কেন আমরা সেই তিমিরেই থেকে যাব।কখনও কখনও দালালরাও বিচারের মুখোমুখি আসে কিন্তু দালালদের রক্ষা করার জন্য যখন ক্ষমতাধর দালাল চক্র দাঁড়িয়ে যায় তখন প্রহসন ছাড়া সাধরণ মানুষ আর কিছু দেখে না। দালালের খপ্পরে পড়া মানুষের করুন কাহিনি কি একটুও নাড়া দেয় না জাতির বিবেককে?

দালাল নিয়েও আছে রাজনীতি, আছে এলাকাভিত্তিক দলাদলি আর দলীয় আশ্রয় প্রশ্রয়। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের দালালী করে দেশের ক্ষতি করেছিল যেসব ঘৃনিত দালালেরা তাদের যেমন ধিক্কার জানায় এ দেশ ও জাতি, তেমনিভাবে আজ স্বাধিন দেশের মানুষকে জিম্মি করে যে অসাধু দালাল চক্রের উদ্ভব হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ এরও সঠিক নিয়ন্ত্রন চায় দেশের মালিক জনগণ। এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর আইন।

 

তৌফিক আহমেদ, লেখক, সাংবাদিক, নাট্যজন।


নতুন কাগজ | মুমতাহিন রিতা

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন