দার্শনিকদের চোখে ভালোবাসা

0
27

আবু মহি মুসা: প্রেম বা ভালোবাসার তাত্ত্বিক অর্থ এত বিস্তৃত এবং গভীর যে, ব্যাখ্যা না দিয়ে সংজ্ঞার সীমাবদ্ধতার মধ্যে এর বিভিন্নমুখী তাৎপর্যকে তুলে ধরা সম্ভব নয়। সম্ভবত এই একটি মাত্র জটিলতার কারণেই ভালোবাসার সংজ্ঞা নিয়ে অধিকাংশ দার্শনিক মাথা ঘামাননি। ভালোবাসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার আগে অন্য মনীষীরা কি বলেছেন, এটা আমাদের জেনে নেয়া দরকার। ভালোবাসা সম্বন্ধে পৃথিবীর বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক বার্নার্ডশ বলেছেন, ‘প্রেম হলো সিগারেটের মতো যার আরম্ভ অগ্নি দিয়ে, আর পরিণতি ছাইয়ে।’

এ ক্ষেত্রে বার্নার্ডশর দার্শনিক চিন্তার প্রতিফলন অত্যন্ত বিরূপ এবং প্রতিক্রিয়াশীল। হয় বলতে হবে প্রেম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না, নয়তো বলতে হবে তার এ মতবাদ প্রেমের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার এক আত্মপ্রবঞ্চনা, আঙ্গুর ফল টক এই প্রবাদের মতো। এ মতবাদ নিয়ে আর আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। ভালোবাসা সম্বন্ধে বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘সুখের গোড়ায় ভালোবাসা। ভালোবাসার স্পর্শ ব্যতীত সুখের স্বাদ পাওয়া যায় না।’

এ বক্তব্যটির তাৎপর্য বিশেষণ করলে ভালোবাসা সম্বন্ধে বার্ট্রান্ড রাসেলের মতবাদ সম্পূর্ণ সত্য বলে গ্রহণ করা যায় না। সুখ বলতে কি বোঝায়, এটা কিন্তু তিনি বলেননি। তবে সুখ বলতে যা বোঝায় তা কেবল নর-নারীর যৌন মিলনের মধ্যে নিহিত। পরিপূর্ণ যৌন সুখের একটি শর্ত হচ্ছে ভালোবাসা। দর্শনের গভীরতায় বার্ট্রান্ড রাসেলের বক্তব্যের সত্যতা যতটা খুঁজে পাওয়া যায় দার্শনিক দৃষ্টির প্রখরতা তার ততটা ছিল না। অথচ তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ সত্য না হলেও একদম ফেলে দেয়া যায় না। কারণ এ বক্তব্যটি স্বামী-স্ত্রীর ( প্রেমিক-প্রেমিকার) বেলা প্রযোজ্য। তবে ভালোবাসা কি এ সম্পর্কে তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য মতবাদ পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে অনেকে মনে করেন, ‘প্রেম ব্যতীত কোনো নারীর সঙ্গে মিলিত হওয়া আর বাজারের স্বৈরিণীর সঙ্গে মিলিত হওয়া সমান।’ যারা এমন মনে করেন এটা তাদের ব্যক্তিগত অভিমত। এ দিয়ে ভালোবাসা কি তা বোঝায় না। ভালোবাসার প্রথম শর্ত হচ্ছে মানসিক আকর্ষণ। মানসিক আকর্ষণ না থাকলে পতিতার সঙ্গেও মিলিত হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। পতিতার সঙ্গে মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে সেই পতিতার সম্মতি থাকা বাঞ্ছনীয়। আর সম্মতি না থাকলে সেখানে মিলিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে ধর্ষণ।

বস্তুর গুণ যেমন ভাবের বিষয়, তেমনি ভালোবাসা এবং সুখ ভাবের বিষয় হলেও ভালোবাসা হচ্ছে বৈষয়িক ও সুখ হচ্ছে আধ্যাত্মিক। ভালোবাসা এমন একটি ভাবার্থক শব্দ যার তুলনা শুধু আয়নার সঙ্গেই চলে। আয়নার সামনে যে যেভাবে দাঁড়ায় তার প্রতিবিম্ব এবং রূপ ঠিক সেভাবেই ফুটে ওঠে। আয়নার কাছে ব্যক্তির সৌন্দর্যের যেমন কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই, ভালোবাসা শব্দের ক্ষেত্রেও তাই। ভালোবাসা শব্দ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে সমান। পার্থক্য এই যে, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভালোবাসার তাত্ত্বিক অর্থ ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন মা ছেলেকে ভালোবাসে, বাবা মেয়েকে ভালোবাসে, ভাই বোনকে ভালোবাসে, স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসে, প্রেমিক প্রেমিকাকে ভালোবাসে। ব্যক্তি, বস্তু, প্রাণী এবং স্রষ্টা- সবার প্রতি সবার ভালোবাসার তাত্ত্বিক অর্থ এক নয়। ভালোবাসার দাবি বিভিন্ন প্রকৃতির। মা যে দৃষ্টিতে ছেলেকে ভালোবাসেন, প্রেমিকা কি সেই দৃষ্টিতে প্রেমিককে ভালোবাসতে পারে? অথচ ভালোবাসার একটি মাত্র শব্দাবরণ দিয়ে মা-বাবা, ভাইবোন, প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী সবার ভালোবাসার ভাবগত গোপন জিনিসটিকে ঢেকে রাখা হয়েছে। জিনিসটি কোন প্রকৃতির এটা ওইসব মনীষী নির্ধারণ করতে পারেননি। শুধু এই জটিলতার কারণেই কোনো দার্শনিকের পক্ষে ভালোবাসার সঠিক সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব হয়নি। ভালোবাসা সম্পর্কে মনীষীরা সবাই কম-বেশি চিন্তা করেছেন এবং তাঁদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার কথাও ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তাঁদের বক্তব্যের সারবস্তু নির্দিষ্ট গ-ির বাইরে চলে গেছে। যেমন অনেকে বলেছেন, ভালোবাসা মানে শক্তির অপচয়। এর মধ্যে ভালোবাসার রূপ, প্রকৃতি বা মাহাত্ম্য কি তা খুঁজে পাওয়া যায়? মূলত ‘ভালোবাসা’ শব্দটি যে ভাষায় প্রথম প্রচলন শুরু হয়েছে এবং যিনি এর আবিষ্কারক তিনিও কি জানতেন ভালোবাসা কি? অবশ্যই জানতেন বলে আমরা মনে করি না। প্রেম সম্পর্কে যাযাবর তাঁর একটি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা। প্রবঞ্চিতকে দেয় দাহ।’

খুবই চমৎকার কথা বলেছেন তিনি। সাহিত্যে হয়তো এ বক্তব্যের মূল্য আছে। তবুও তাঁর এ বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত হতে পারি না। তিনি কি বোঝাতে পেরেছেন প্রেম কি? প্রেম দাহ দেয় বলেই প্রেম অনেকের জীবনে সিগারেটের মতো। এর পাশাপাশি আমরাও তো বলতে পারি, ‘জীবনী শক্তির অপর নাম প্রেম অথবা প্রেমের অপর নাম জীবনী শক্তি।’ যে কারণে কীটসের মতো মনীষী বলে গেছেন, ‘ভালোবাসা যে পেল না, আর ভালোবাসা যে কাউকে দিতে পারল না, সংসারে তার মতো দুর্ভাগা নেই।’ এ কথার সঙ্গে আমরা একমত। ভালোবাসার অভাব এমনকি মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এর একটা সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় জার্মান দার্শনিক শোফেনহাওয়ারের জীবনে। তাঁকে বলা হয় নৈরাশ্যবাদী। শৈশবে তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটেছে। পিতৃবিয়োগের পর মা তার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে অপরের শয্যাসঙ্গিনী হতেন। ফলে মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু দেহ নিয়েই জীবন নয়, দেহের সঙ্গে একটা আত্মাও রয়েছে, আর আছে একটি মন। আত্মিক কারণে মানুষের জীবনে ভালোবাসার প্রয়োজন। ভালোবাসা মানে শক্তির অপচয় অথবা জীবনী শক্তির অপর নাম ভালোবাসা। এ দিয়ে ভালোবাসার রূপ ও প্রকৃতি বোঝা যায় না। তবে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এর মধ্যে সত্যতা যে একদম নেই, তা বলা যাবে না। প্রত্যেকটি বস্তুর যেমন ভালো-মন্দ দুটো দিক আছে, ভালোবাসারও তেমনি দুটো দিক আছে। প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম ব্যর্থ হলে শক্তির অপচয়ের কথা বলা যায়। কিন্তু মা ছেলেকে ভালোবাসে, এখানে কি প্রমাণ করা যায় যে, ভালোবাসা মানে শক্তির অপচয়? তাই কোনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কুৎসিত চেহারা দেখে আয়নাকে কুৎসিত ভাবা যায় না। বার্নার্ডশর চোখে প্রেম যেমন সিগারেটের আগুন, তেমনি অনেকে আবার মনে করেন প্রেম হচ্ছে ফুলের সুবাস। প্রকৃত পক্ষে প্রেম সিগারেটর আগুনও নয়, আর ফুলের সুবাসও নয়। প্রেম এমন কিছু স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সিগারেটের আগুনও ছড়াতে পারে, আবার ফুলের সুবাসও ছড়াতে পারে।

ফ্রয়েড এবং ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের সমর্থক পন্ডিতরা মনে করেন, সব প্রেমের উৎস হচ্ছে কাম। এমনকি বাবা-মার প্রতি শিশুরা যে প্রেমের পরিচয় দেয় তাও কামসঞ্জাত। শিশুকন্যার মনে সুপ্ত থাকে বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কামনা। শিশুপুত্র অনুরূপভাবেই মাকে কামনা করে।

ডা. ফোরেন সরাসরি বাবা-মেয়ে এবং মা-ছেলের মধ্যে যৌন সম্পর্কের কথা না বললেও তাঁর মতবাদ যৌনগন্ধযুক্ত। তাঁর মতে, ‘প্রেমকে অন্য কথায় আদি কামবৃত্তি বলা যায়।’ বয়ার (ইধঁবৎ) প্রমুখ মনীষীর মতে, ‘প্রেম শব্দটার পরিবর্তে মনে করতে হবে কতগুলো অজ্ঞাত প্রবল প্রেরণার কথা, যাদের প্রভাবে নর ও নারী পরস্পরে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে অনুভব করে থাকে।’

হার্বাট স্পেন্সার প্রেমের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, প্রেম দেহ ও মনের বহু সূক্ষ্ম উপকরণ নিয়ে গঠিত। যেমন ১. দৈহিক যৌনবৃত্তি, ২. সৌন্দর্য উপভোগবৃত্তি, ৩. মায়া-মমতা, ৪. সম্মানবোধ, ৫. অনুমোদন ভিক্ষা, ৬. আত্মসম্মানবোধ, ৭. নিজস্ব মনে করা, ৮. ব্যক্তিত্বের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কর্মস্বাধীনতা এবং সহানুভূতিসূচক মনেবৃত্তিগুলোর উন্নয়ন।

এখানে ফ্রয়েড, ফোরেন, বয়ার এবং হার্বাট স্পেন্সার প্রত্যেকে প্রেমকে যৌনবৃত্তির সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। তাঁদের ধারণা, কামভাবকে বাদ দিয়ে প্রেমের তাৎপর্য তুলে ধরা সম্ভব নয়। অন্যদিকে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘কামনা আর প্রেম এ দুটো হচ্ছে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। কামনা একটা প্রবল সামাজিক উত্তেজনা আর প্রেম হচ্ছে ধীর, প্রশস্ত ও চিরন্তন।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ভালোবাসা দুজনের দেহকে দুদিক থেকে আকর্ষণ করে মিলিয়ে দেয়, সে ভালোবাসা নয়, সেটা অন্য কিছু বা মোহ আর কামনা।’

এসব মনীষীর বক্তব্যে মনে হয়েছে, কেউ যেন প্রেম বা ভালোবাসাকে যৌন কামনা থেকে ভিন্ন করে দেখতে পারেননি । এর পাশাপাশি আমার প্রশ্ন, একজন ব্যক্তি কোনো একটি বস্তুকে ভালোবাসতে পারে অথবা পশুপাখিকে ভালোবাসতে পারে, সেখানে কি যৌন কামনার কোনো ব্যাপার আছে? আমার বড় ছেলেকে তার নানা খুবই ভালোবাসতেন, তার মৃত্যুতে ছেলেটা যতটা কেঁদেছে তার চেয়ে বেশি কেঁদেছে তার প্রিয় ময়না পাখিটা যখন মারা গেল। এ ভালোবাসার মধ্যে কি যৌন কোনো ব্যাপার খুঁজে পাওয়া যাবে? এ প্রসঙ্গে আমরা বর্বর যুগের দিকে ফিরে তাকাতে পারি, যখন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কোনো কিছু ছিল না। মানুষ পশুর মতো বনেজঙ্গলে জীবনযাপন করত। সে সময় পুরুষের মধ্যে কামভাব ছিল। যে যেভাবে পেরেছে নারীকে ভোগ করে চলে গেছে। সেখানে কামনার বস্তু ছিল নারী দেহ। এ কারণে সে যুগে নারীরা কেবল ভোগের সামগ্রী হয়েছে কিন্তু ভালোবাসার পাত্রী হয়নি। যারা যৌনতাকে প্রধান্য দিয়ে প্রেমের মধ্যে যৌনতাকে এভাবে টেনে এনেছেন, প্রেম সম্পর্কে তাদের সঠিক কোনো ধারণা ছিল না।

প্রেমের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হার্বাট স্পেন্সার যে উপকরণ এখানে তুলে ধরেন তাতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, কিন্তু স্বতন্ত্র তাৎপর্য বহন করে না। প্রায় সবার ধারণার মধ্যে এক সুর খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যদিকে মনীষী ফ্রয়েডের বক্তব্য শুধু নিম্ন মানেরই নয়। বিভ্রান্তিকরও। তিনি বলেছেন, শিশুকন্যার মনে থাকে বাবার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কামনা।

কিন্তু বাবা তার শিশুকন্যার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কি তাকে ভালোবাসেন? যদি তাই না হয়, তাহলে বাবার এ ভালোবাসার উৎস কোথায়? মা তার শিশুপুত্রকে কেন ভালোবাসেন? মা বৃদ্ধা হয়ে যাওয়ার পরও ছেলে তার মাকে ভালোবাসে, এ ভালোবাসার উৎস কোথায়? অবশ্য ভালোবাসার উৎস যে কাম, এ মতবাদকে অনেক মনীষী স্বীকার করেননি। কিন্তু হিংস্রতার উৎস যে এই কাম হতে পারে এটা সরাসরি বলা যায়। কামভাব থেকে নারীকে ধর্ষণ করা হয় এবং ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা করার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো দেশেই বিরল নয়।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন