Natun Kagoj

ঢাকা, সোমবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

চাঞ্চল্যকর অপহরণ-১| চলমান- কল্পনা চাকমা হুদু?

আপডেট: ১৫ জুলা ২০১৭ | ১৬:৪৬

আবু সাঈদ আহমেদ

পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউমেন হিলস ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমাকে ১৯৯৬ সালের ১১ জুন মধ্যরাতে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাইল্যাঘোনার নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। কল্পনার পরিবার থেকে অপহরণকারী হিসেবে তৎকালীন সময় রাঙামাটিতে কর্তব্যরত সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়।

দেশ ও বিদেশে সংগঠিত বিভিন্ন জনমত ও আন্দোলনের চাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একই সাথে সরকার পুলিশ বিভাগের মাধ্যমেও তদন্ত পরিচালানা করে। কল্পনার পরিবারের পক্ষ থেকে  অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলেও তারা থেকে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অপরদিকে পুলিশ ‘ক্লুলেস’ ও ‘সেনসেশনাল’ কেস উল্লেখ করে প্রথম থেকেই তদন্তের ইতি টানতে আগ্রহী।

ঘটনার দুই দশক পরে অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাঙামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান স্বাক্ষরিত কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমার তদন্তকালে ভিকটিমের অবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় তাহাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই। এই লক্ষে্য বিশ্বস্ত গুপ্তচর নিয়োগ ছাড়াও বাদীর পক্ষে এবং এলাকার লোকজনদের সহায়তা কামনা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করিয়াও ভিক্টিম কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার এবং মামলার রহস্য উদঘাটন হয় নাই। বিধায় মামলা তদন্ত দীর্ঘায়িত না করিয়া বাঘাইছড়ি থানার চূড়ান্ত রিপোর্ট সত্য নং ০৩, তারিখ ৭/৯/২০১৬, ধারা ৩৬৪ দ: বি: বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করিলাম। ভবিষ্যতে কল্পনা চাকমা সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া গেলে বা তাহাকে উদ্ধার করা সম্ভব হইলে যথানিয়মে মামলাটির তদন্ত পুনরুজ্জীবিত করা হইবে।’

কল্পনা চাকমা অপহরণের ২১বছর অতিবাহিত হয়েছে।কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও আজও সঠিক তথ্য ও সন্ধান মেলেনি হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী কল্পনার। অপহৃতের পরিবার ঘটনার পর থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, বাঘাইছড়ির কজইছড়ি সেনা (১৭ ই.বি.রেজি.) ক্যাম্পের তৎকালীন কমান্ডার লে. ফেরদৌস কায়ছার খান, ভিডিপি’র পিসি নুরুল হক ও ভিডিপি সদস্য সালেহ আহমেদ’র নেতৃত্বে ১০-১২ জনের পরিচিত-অপরিচিত সশস্ত্র সেনা-ভিডিপির জওয়ান মধ্যরাতে কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। একই সময় অপহরণ হওয়া বড় দুইভাই বেঁচে ফিরলেও কল্পনার কোনো তথ্য দিতে পারেনি প্রশাসন।

কল্পনা চাকমার সঙ্গে অপহৃত হয়েছিলেন বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা। তিনি পালিয়ে ফিরতে সক্ষম হন এবং পরের দিন (১২ জুন ’৯৬) বাদী হয়ে জড়িত কয়েক জনকে চিহ্নিত করে এফআইআর করেন। গত দুই দশক ধরে তিনিই বিভিন্ন সময় আদালতে হাজিরা ও শুনানিতে অংশ গ্রহণ করছেন। একই সাথে অব্যহত রেখেছেন ‘কল্পনা চাকমা হুদু’ (কল্পনা চাকমা কোথায়?) আন্দোলন।  তার সাথে মুখোমুখি সাক্ষাৎ হতেই জিজ্ঞেস করলাম-কেমন আছেন? উত্তরে জানালেন, ‘পারিবারে আমরা শারীরিক ভাবে ভাল আছি, কিন্তু মানসিকভাবে ভাল নেই। কল্পনাকে হারানোর ২১ বছর হয়ে গেলো কিন্তু এখনই বিচার শেষ হলোনা। আমাদের মা কল্পনার বিচার না দেখে আর শোকে শোকে ২০০৪ সালে মারা গেলেন। আমরা এতটাই অসহায় যে কেসটার কিছুই করতে পারছি না। আমরা যাদের নাম বলেছিলাম আর সংশ্লিষ্ট প্রমাণ দিয়েছিলাম সরকার তাদের সাজা দিতে পারছে না। আমি নিশ্চিত- এখানে একটা ষড়যন্ত্র কাজ করছে। কী বলবো? আপনিই বলুন আমরা ভাল থাকি কিভাবে!’

কালিন্দী কুমার চাকমাকে কল্পনা চাকমার অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে বললেন, ‘ এখনও কল্পনার অন্তেষ্ট্যিক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারিনি। কারণ, অপহরণের পর তার শেষ অবস্থা আমাদের জানানো হয়নি। তাই আমাদের ধর্ম অনুসারে কিছুই করতে পারছি না।’

অপহৃত হবার সময়ে কল্পনা চাকমা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউমেন হিলস ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার অপহরণের পর উদ্ধার আন্দোলনে এই সংগঠন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কল্পনা চাকমার পরিবারের বর্তমান অবস্থা ও বিচার প্রক্রিয়া বিষয়ে সংগঠনের বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরুমা চাকমা জানালেন, ‘ আসলে উনারা (কল্পনা চাকমার পরিবার) এমনিতেই অনেক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বারবার আদলতে হাজির হওয়া, তারিখ বদল, আইনি প্রক্রিয়া সচল রাখা, তদন্ত কর্মকর্তার বদল একধরনের হয়রানি।’

কল্পনা চাকমার অপহরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কল্পনা ছিলেন ভীষণ সাহসী। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কখনও ভয় পেতেন না। তিনি লে. ফেরদৌসের অন্যায়েরও প্রতিবাদ করেছিলেন। তার প্রতিবাদ চিরদিনের জন্য রুখে দিতেই লে. ফেরদৌসের নেতৃত্বে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। সরকার চাইলে দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে পারত।’ তিনি আরও যোগ করলেন, ‘তাছাড়া আমরা যারা এই ধরনের  জাতিসত্ত্বার আছি সেই অবস্থা থেকেই এই ধরনে বিচার হয় না। কল্পনা চামকার অপহরণেরও তো ২১ বছরে বিচার শেষ হলো না।’

প্রসঙ্গত, অপহরণের ১৫ দিন পর অর্থাৎ ২৭ জুন ’৯৬ বাঘাইছড়িতে কল্পনা চাকমার মুক্তির দাবিতে হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পাহাড়ি গণপরিষদ এবং পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালনকালে পাহাড়ি বাঙালিরা পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে গুলি করে রুপন চাকমা (১৫)কে হত্যা করে। রাস্তায় ধাওয়া করে ধরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়  মনোতোষ চাকমা (১৫), সমর বিজয় চাকমা (১৬) ও সুকেশ চাকমা (১৬)কে। এই চার হত্যার তদন্তও এখনো শেষ হয়নি।

কল্পনা চাকমার ভাই কালিন্দী চাকমা পাহাড়ি বাঙালিদের হাতে নিহত চার আদিবাসীর পরিবারের প্রসঙ্গে বললেন, ‘সেদিন পাহাড়ের কিছু বাঙালি পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে হাজার হাজার মানুষের সামনে যে রুপনকে গুলিকে মেরে ফেললো, মনোতোষদের কুপিয়ে মেরে ফেললো তারও তো বিচার পেলাম না।’

কল্পনা চাকমা ফিরে আসবেন কি না জানা নেই। তার অপহরণের মামলা শেষ কবে হবে সেটাও জানেন না কেউ। হতাশ কণ্ঠে কল্পনা চাকমার ভাই কালিন্দী চাকমা বললেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সহযোগিতা, মামলার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়ায় বিচার প্রক্রিয়া এখনও সচল আছে, এখনও থেমে যায়নি।’


 


নতুন কাগজ | শাওন চৌধুরী

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন