ক্রসফায়ার: ধর্ষক মরবে, ধর্ষণ চলবে

0
148

আবু সাঈদ আহমেদ

ধর্ষককে ক্রসফায়ারে মারার দাবীতে একটি পক্ষ সোচ্চার হয়েছেন। এই পক্ষটি মনে করেন ধর্ষণরোধের একমাত্র উপায় আটকের সাথে সাথে ধর্ষককে ক্রসফায়ারে হত্যা করা। বিচার করার কোনো প্রয়োজন নেই। এই ধরনের দাবীতে যতটা অরাজক ফ্যান্টাসি মিশে আছে, তার চাইতে বেশী মিশে আছে আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রতি উদাসীন অনাস্থা ও অনাগ্রহ।

ক্রসফায়ারের পক্ষে যারা সোচ্চার আছেন, তারা হয়তো জানেন না ক্রস ফায়ার একটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। কখনোই একটি অপরাধ দিয়ে আরেকটি অপরাধ নির্মূল করা যায়না। যদি অপরাধ দিয়ে অপরাধ দমন করা যেত তবে গত দশ বছরে পুলিশ ও র্যাববাহিনী মিলে যতগুলো ক্রসফায়ার করেছে তাতে দেশে কোনো অপরাধী থাকতো না।

ধর্ষককে ক্রস ফায়ারে হত্যা করার তীব্র নিন্দা ও আপত্তি জানাই দুটো কারণে-
প্রথমত: ধর্ষককে ক্রসফায়ারে দিলে দীর্ঘ মেয়াদে ধর্ষণ কমার বদলে বাড়বে। ধর্ষক যখন জানবে ধরা পরলে তার ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হবার সম্ভবনা রয়েছে, তখন ধর্ষক নিজের প্রাণ বাঁচাতে ধর্ষিতাকে হত্যা করবে। ধর্ষণের শেষে খুন ফ্রি। অবশ্য, ধর্ষিতোকে খুনের কালচার ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত: অন্যায় দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। একটা অন্যায় দিয়ে আরেক অন্যায়কে যেমন জাস্টিফাই করা যায়না, তেমন একটা অপরাধ দিয়ে আরেকটা অপরাধরকে রোধ করা যায়না। বরঞ্চ অপরাধের মাধ্যমে অপরাধ দমন করতে গেলে সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলোর ফরমেট/ধরণ বদলে যায়। যেমন ধর্ষণের সাথে এখন খুন ফ্রি, এর আগে ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠলে আমরা ফরমেট বদলে যেতে দেখেছিলাম, তখন ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা আর পুলিশ/র্যাবের উপরে অতর্কিতে হামলা চালাতো না। দেখা যেতো পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে পালাতে গিয়ে গাড়ির নিচে পিষ্ঠ হয়ে অভিযুক্ত লোকটি মারা গেছে।

ধর্ষণ বা ব্যাংক লুটের বিচারের মত সিলেক্টিভ অপরাধীর বিচার যারা চান তারা সকল অপরাধের বিচারের দাবিতে আওয়াজ তুলুন। কারণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সকল অপরাধকেই উৎসাহিত করে, বিস্তার ঘটায়। একটা অপরাধের সাথে অন্যান্য অপরাধের মেলবন্ধন সৃষ্টি করে। তাই শুধু ধর্ষকের নয়, সকল অপরাধের জন্যই অপরাধীর বিচার ও শাস্তি কার্যকরের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।

ধর্ষকসহ অন্যান্য অপরাধীরা কেনো উৎসাহিত হয়-
পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচার বিভাগ মিলেমিশে কাজ করে। অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করে এবং শাস্তি কার্যকর করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পুলিশবাহিনী বিশ্বাস করেনা র‌্যাবকে, র‌্যাবের আস্থা নেই পুলিশবাহিনীর প্রতি। পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী প্রায়ই অপরাধের বিচার না হওয়ার জন্য সকল দায় চাপিয়ে দেয় বিচার বিভাগের উপরে।

বিচার বিভাগ চুপ থাকবে কেনো? বিচার বিভাগ আবার দায়িত্বজ্ঞানহীন বা উদ্দেশ্যমূলক তদন্তের অভিযোগে অভিযুক্ত করে পুলিশ-র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে। একইসাথে দু:খজনক ও হাস্যকর যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ দুর্বল/উদ্দেশ্যমূলক/দায়িত্বজ্ঞানহীন তদন্তের জন্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে অভিযুক্ত করলেও কোনো শা্স্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় না।

প্রকৃতপক্ষে, এই দেশে কেউ যে ক্ষমতাবান ও বিত্তবান, ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে জোড়ালো সম্পৃক্তা আছে বা রাখে, সে পুলিশ-র‌্যাব-আদালত সবকিছুতেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তদন্ত রিপোর্ট থেকে বিচারের রায় পর্যন্ত অনায়াসে কিনতে পারে।

এই অরাজকতার যতদিন অবসান না হবে, ততদিন ক্রস ফায়ার হোক আর ডাইরেক্ট ফায়ার হোক- ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধ চলবেই। রাষ্ট্র যখন অপরাধ দমনে নিজেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে দায়মুক্তি দেয়, তখন অপরাধ চলমান থাকাই শেষ কথা।

 

পুনশ্চ: আমার প্রিয় কয়েকজন বন্ধু ধর্ষককে ক্রস ফায়ারে মারার পরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে তারাও বিশ্বাস করেন এই স্বস্তি সাময়িক। অপরাধের বিচার হতে হবে, ক্রসফায়ার দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। উপরের পোস্টটি তাদের জন্য যারা মনে করেন ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি ক্রসফায়ার।

 আবু সাঈদ আহমেদ, লেখক ও এক্টিভিস্ট।