Natun Kagoj

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী

কাশেম বিন আবুবাকার আর ‘ডিস্টিংসন: আ সোশ্যাল ক্রিটিক অব দ্য জাজমেন্ট অব টেইস্ট’ এর প্রাথমিক পাঠ

আপডেট: ০৮ মে ২০১৭ | ২০:৪১

জাহেদউররহমান

‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্তকে চরম বিরক্তি (কিংবা স্যাডিস্টিক বিনোদন) থেকে মুক্তি দিয়ে মূল ধারার এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কাশেম বিন আবুবাকার ঝড় এখন শেষ প্রায়। এক দিক বিবেচনায় আমার এই লিখাটি অসময়ে লিখিত হচ্ছে; ভেবেছিলাম লিখার আগে ভদ্রলোকের লিখা অন্তত একটি উপন্যাস পড়ে নেই। ‘ফুটন্ত গোলাপ’ পড়তে কিছুটা সময় লাগলো, আর এরপর ব্যক্তিগত কিছু ঝামেলা সামলে লিখতে বসে ‘গরম’ ইস্যুটি এই মুহূর্তে অনেক ‘ঠান্ডা’ হয়ে গেছে। অবশ্য ‘ঠান্ডা’ অবস্থায় লিখাটা আরেক দিক থেকে ভালো, উত্তেজনাবর্জিত হয়ে লিখা (এবং পড়া) যায়।

‘ফুটন্ত গোলাপ’ পড়তে গিয়ে আমার বার বারই মনে হয়েছে কাশেম বিন আবুবাকার এর সাহিত্য (আমি জানি, আমাদের ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্ত রা এই শব্দটি নিয়ে তুমুল আপত্তি করেন) একাডেমিক ডিসকোর্স দাবী করে। আমরা এতদিন সেটা করিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু আজ যখন বিদেশী সংবাদ সংস্থায় রিপোর্টের সূত্র ধরে কাশেম বিন আবু বকর আমাদের সামনে নতুন করে তুমূলভাবে এলেন, তখনও কিন্তু আমরা সেটা করলাম না, বরং মেতে থাকলাম অত্যন্ত নিচুমানের ট্রলে। যারা কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করেছে  প্রায় সব ক্ষেত্রে সেটাও ছিল অত্যন্ত অগভীর, ভয়ঙ্কর বিদ্বেষপূর্ণ হেজিমোনিক আচরণ। অবশ্য এটাই হবার কথা ছিল; সে প্রসঙ্গে আসছি পরে।

পৃথিবীর সব দেশেই কী সাহিত্যে, কী শিল্পে ‘পপুলার’ একটা ধারা থাকেই। বলা বাহুল্য সেই ধারার প্রত্যাশাই থাকে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ সেই পণ্য (হ্যাঁ, শিল্প/সাহিত্য, হোক সেটা পপুলার/সিরিয়াস আদতে সেটা পণ্যই) গ্রহণ করবে। তাই একজন পপুলার ধারার সাহিত্যিক চেষ্টাই করেন মানুষের আবেগের জায়গা খুঁজে বের করতে, এবং সেখানটাতেই স্পর্শ করতে। সেটা জানলেও সবাই যে পপুলার হতে পারবেন, এটাও নিশ্চিত না, এখানেই একজন বিশেষ লেখকের মুন্সিয়ানা। আমাদের ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্ত এর অতি জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদও এটা পেরেছেন, যদিও এই শ্রেণীটিকে টার্গেট করে লিখেছিলেন অনেকেই।

কাশেম বিন আবু বকর মূলতঃ প্রেমের উপন্যাস লিখেন, কেউ কেউ যাকে ‘শরিয়া সম্মত প্রেম’ বলে বিদ্রুপ করছেন। অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান তিনি নিজেও মনে করেন, প্রাক-বৈবাহিক কোন প্রেম শরিয়া সম্মত হতে পারে না, কিন্তু যুবক-যুবতীদের মধ্যে প্রেমকে ঠেকিয়ে রাখাও সম্ভব না। তাই তিনি প্রেমকে স্বীকার করে নিয়ে অবিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে মেলামেশার মধ্যে একটা সীমারেখা টানতে চেয়েছেন, আর চেয়েছেন এর মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের মূলনীতি শিক্ষা দিতে। ব্যাখ্যাটা কি যৌক্তিক হলো? না, এইটা স্রেফ ‘ভগিচগি’ দেয়া হলো। অবশ্য তাঁর এই ‘ভগিচগি’ অবশ্য খুব অভাবনীয় বিষয় না।

আরেকটা ‘ভগিচগি’ দেবার উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে কেন কাশেম বিন আবু বাকার ওই ‘ভগিচগি’ দিয়েছেন। ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্তের অতি প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদকে এক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাঁর উপন্যাসের সব নায়িকা কেন খুব সুন্দরী থাকে। তিনি বলেছিলেন, নায়িকার রূপ দেবার ক্ষমতা যেহেতু তাঁর হাতেই, তাই তিনি তাদেরকে রূপ দিতে কেন কার্পণ্য করবেন? তাঁর সাক্ষাৎকারটি পড়েছিলাম অনেক কাল আগে, কিন্তু তাঁর কথা বিশ্বাস করার মতো আহাম্মক তখনও ছিলাম না। তাঁর উপন্যাসের নায়িকা সেই কারণেই সুন্দর হয়ে থাকে, যে কারণে পপুলার সিনেমার নায়িকারাও সুন্দরী হয়। পপুলার সাহিত্যের স্রষ্টরা মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য নানা রকম কাজ করেন, যেগুলোর জবাব সৎভাবে দেবার সাহস প্রায় সবারই থাকে না। তাই এমন ‘ভগিচগি’দেন তাঁরা। সিনেমার কোন অভিনেত্রী পূর্ণ বা আংশিক নগ্নতা প্রদর্শন করলে যেমন বলেন, সেটা করেছেন চরিত্রের প্রয়োজনে।

পপুলার সাহিত্যিকরা চিরকালই সিরিয়াস সাহিত্যিক এবং তাদের পাঠকদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে এসেছেন। প্রয়াত হুমায়ূন আজাদ হুমায়ূন আহমেদ-ইমদাদুল হক মিলন দের মতো সাহিত্যিকদের লিখিত উপন্যাসকে ইঙ্গিত করে নাম দিয়েছিলেন ‘অপন্যাস’। মজার ব্যাপার আজ আমাদের সামনে যখন কাশেম বিন আবু বাকার দাঁড়িয়ে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে তখন অনেক হুমায়ূন আহমেদ-ইমদাদুল হক মিলন ভক্ত তাঁর উপন্যাসকে সাহিত্য হিসাবে মূল্য দিতে নারাজ। এর কারণ অনুসন্ধানের আগে আবু বকর এর আরেকটা বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

আবু বাকার নাকি চটি (শব্দটি আমরা বুঝি আশা করি) লেখক। ফেইসবুকে অনেকে তাঁর লিখা উপন্যাস থেকে কিছু বাক্য তুলে দিয়ে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। আমার কাছে বাক্যগুলো আদৌ তেমন কোন ইরোটিক বাক্য বলেও মনে হয়নি। আমরা বেড়ে উঠেছিলাম সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে। বিশেষ করে ‘মাসুদ রানা’ না পড়ে কেউ বড় হয়ে যাবে সেটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। অনেক মাসুদ রানা’য় খুব সফট ইরোটিক কিছু সিচুয়েশন থাকতো। বলতে দ্বিধা নেই, মাসুদ রানার এডভেঞ্চার মূল আকর্ষণ হলেও সেই ইরোটিক বিষয়গুলো সেই টিন বয়সে অনেক আকর্ষণ করতো। খুব ভালোভাবেই বুঝি এসব বিষয় পপুলার সাহিত্যের খুব স্বাভাবিক বিষয়। এখন প্রশ্ন হলো কাজী আনোয়ার হোসেনও কি চটি লেখক? আর আমাদের তথাকথিত মূল ধারার অনেক সাহিত্যিকের অনেক লেখায় ইরোটিসিজম যে পরিমাণে পাওয়া যায়, তার কাছে তো কাশেম বিন আবু বাকার বা কাজী আনোয়ার হোসেন একেবারেই শিশু। তাঁরা তাহলে কী? মানি, আবু বাকারকে এই প্রশ্ন করাই যায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটছে বলেই যদি ওইসব বিষয় ইঙ্গিতেও লিখা যায়, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটা সঙ্গমও কি উপন্যাসে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দেয়া যায়, এটা তো অবিবাহিত যুগলের মধ্যে হচ্ছে না এই যুক্তিতে? আবুবাকার কে ‘চটি লেখক’ বলার মতো ভয়ঙ্কর অন্যায় প্রমাণ করে আমরা আসলে চেয়েছি আবুবাকারকে যে কোন মূল্যে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে।

ফিরে আসি ‘ফুটন্ত গোলাপ’ পড়ার অভিজ্ঞতায়। খুব ছোটবেলা থেকে নিয়মিত পড়ার কারণে আমি খুব দ্রুত পড়তে পারি, কিন্তু এই বইটি পড়তে আমার খুব কষ্ট হয়েছে। তাঁর এই উপন্যাস আমার ভালো লাগেনি একদম।  এটা প্রমাণ করে আমি অবশ্যই  সেই শ্রেণীটির অংশ নই আবুবাকার যাদের জন্য লিখেছেন। তাঁর লিখার নানাদিক নিয়ে আমার সমালোচনা আছে; সেটা করবো হয়তো কোনোদিন। কিন্তু আমি কোনোভাবেই সাহিত্যিক হিসাবে তাঁকে নাকচ করি না। কিংবা তাঁকে নিচু মানের সাহিত্যিক বলার ধৃষ্টতাও দেখাই না। সেটা বলার আমি কে? কিংবা আপনি?

ফ্রেঞ্চ দার্শনিক পিয়েরে বর্ডিউ সোশ্যাল সায়েন্সে অনেক অবদান রাখলেও তাঁর বই ‘ডিস্টিংসন: আ সোশ্যাল ক্রিটিক অব দ্য জাজমেন্ট অব টেইস্ট’ এর জন্যই সম্ভবত তিনি সবচাইতে বেশি পরিচিত। এই বইয়ে বর্ডিউ আমাদের জানান, রুচির কোন বিচারই ইনোসেন্ট নয়, কারণ এক শব্দে আমরা সবাই উন্নাসিক। আর এই উন্নাসিকতা সবচাইতে বেশি মধ্যবিত্তদের মধ্যে। কারণ তার ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ বেশি। সাংস্কৃতিক পুঁজি (শিক্ষা, মননশীলতা, ভাষার দখল, বাচনভঙ্গি, পোষাক ইত্যাদি) যাদের বেশি, রুচি সম্পর্কে তাদের সিদ্ধান্তই সমাজে ডমিনেইট করার প্রবণতা দেখায়। এই প্রবণতাকে তিনি রীতিমত ‘সিম্বলিক ভায়োলেন্স’ বলেছেন।

বর্ডিও এই প্রবণতার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। পৃথিবীব্যাপী মধ্যবিত্তের মননে সব সময় কাজ করে, তারা কীভাবে তাদের শ্রেণীটিকে অন্যদের চাইতে আলাদা করে তুলতে পারে। এজন্যই এ রকম পরিবারে জন্ম নেয়া প্রতিটি শিশুকে ছোটবেলা থেকে শিক্ষা দেয়া হয়, কোনটা রুচিশীল, আর কোনটা সেটা নয়। একদিন এই শিশুটি বড় হতে থাকে, তাকে তার শ্রেণীর অনেকেই একই ধরণের শিক্ষা ক্রমাগত দিতে থাকে, আর এভাবেই সে আর সব শ্রেণীর রুচিকে স্রেফ নাকচ করে দিতে শিখে যায়। রুচি মাপার জন্য তার মানদন্ডকেই সে সার্বজনীনতা দিয়ে দেয়। সেই মাপে অন্য রুচি ‘নিচু’ কিংবা ‘কোন রুচিই নয়’। ফেইসবুকে কাশেম বিন আবুবাকার এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া ‘বিশিষ্ট’ কলাম লেখক, বা ফেইবুকে ট্রল করা ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্ত, কিংবা হুমায়ূন আজাদ, সবাই এই ব্যাধিতে আক্রান্ত। হ্যাঁ, আমি এটাকে ব্যাধিই মনে করি।

‘ফুটন্ত গোলাপ’ এর নায়ক সেলিম সুদর্শন-সুপুরুষ, শিল্পপতির ছেলে, ভার্সিটির সেরা ছাত্র, দারুন ফুটবল খেলে, জুডো কারাটে বক্সিং এ পারদর্শী, নিজের গাড়ি নিজে ড্রাইভ করে, একাই চারজনকে পিটিয়ে সাইজ করে নায়িকাকে গুন্ডাদের হাত থেকে বাঁচায়, দুর্দান্ত গান করে। আর নায়িকা লাইলী তাকে লাগিয়ে দেয়া সুন্দরী, আই এ তে সব গ্রূপের মধ্যে প্রথম হয়ে ইসলামিক হিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এক অনুষ্ঠানে বিব্রত করার জন্য গান গাইবে ঘোষণা দিয়ে দিলেও সে অসাধারণ গজল গেয়ে সবাইকে তাকে লাগিয়ে দেয়, কিন্তু ওদের প্রাচুর্য নেই, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। প্লটটা চেনা লাগছে? হ্যাঁ, এটা অসংখ্য ব্যবসা সফল পলুলার বাংলা সিনেমার প্লট। এই প্লটে তিনি মুন্সিয়ানার সাথে আরেকটা ডাইমেনশন যোগ করেছেন, ধর্ম, যেটাও অনেক মানুষ ‘খায়’। তিনি স্রেফ একজন পপুলার সাহিত্য রচয়িতা; যা করেছেন শুধু তাঁর পণ্যটিকে তাঁর টার্গেট কনজুমারের কাছে পৌঁছে দেবার স্বার্থেই। এই লিখার প্রভাব কী, যাঁরা পড়ছেন তাঁদের মনস্তত্ত্ব কী, তাঁর লিখার কারণে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক কী প্রভাব পড়বে, সেটা নিয়ে আলোচনা চলাই উচিৎ; এজন্যই শুরুতেই বলেছি তাঁর লিখা একাডেমিক ডিসকোর্স দাবী করে। আর সেটা হওয়া উচিৎ বর্ডিউ বর্ণিত ‘মধ্যবিত্তীয় উন্নাসিকতা’ থেকে মুক্ত হয়ে।

পুনশ্চঃ আসুন সময় করতে পারলে ‘ডিস্টিংসন: আ সোশ্যাল ক্রিটিক অব দ্য জাজমেন্ট অব টেইস্ট’ বইটি পড়ে ফেলি। একটা তথ্য আপনার এই বই পড়তে আরও আগ্রহী করে তুলতে পারে – ইন্টারন্যাশনাল সোশিওলজিক্যাল এসোসিয়েশন এর বিচারে এই বইটি বিংশ শতাব্দীর শেষ্ঠ ১০ টা সোশিওলজি বইয়ের একটা হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

জাহেদউররহমান, শিক্ষক, ব্লগ লেখক ও এক্টিভিস্ট।


নতুন কাগজ | শাওন চৌধুরী

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন