Natun Kagoj

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ | ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

ও-তে ওমরাহ, ব-তে বামরা

আপডেট: ১৯ জানু ২০১৭ | ১৮:৪৭

১আবু সাঈদ আহমেদ: (শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় পাঠক, এই প্রবন্ধটি শুদ্ধ বা প্রমিত বাংলায় লিখিতে পারিলে উত্তম হইতো, কিন্তু কোনোটাতেই লিখিতে ইচ্ছা করিতেছে না। কি আর করা! নিরেট অপ্রমিত ভাষাতেই লিখিলাম। আশাকরি শুদ্ধতাবাদী পাঠক ক্ষমা করবেন।)

ক. যুবক নামে একটা এনজিও আছিলো। যারা স্বপ্ন দেখতো আর দেখাইতো ২০১০ সালে দেশে কোনো বেকার থাকবো না। দেশের বেবাক মানুষ বড়লোক হয়া যাইবো, দুইবেলা পোলাও খাইবো, সুইমিংপুলে নাইবো, বাড়িতে বাড়িতে দুই তিনটা আমেরিকান/ইউরোপিয়ান চাকর পুষবো। যুবকের বিভিন্ন পদে যারা চাকরি করতেন তাগো ‘কোয়াণ্টাম মেথড’ কোর্স করা বাধ্যতামূলক আছিলো। সাবেক মহাজাতক আর বর্তমান গুরুজী যুবকের জন্য তখন স্পেশাল কোর্স পরিচালনা করতেন– যুবকের ফ্রেশ কর্মকর্তা আর কর্মীদের মাথার ভিতর এসব উন্নয়নের মনোছবি গাইথা দিতেন। ( এখন গুরুজীর কোনো কোনো শিষ্য প্রতিবাদে চিক্কুর পাইরা উঠতে পারেন, চিক্কুর পাইরা ওঠার আগে গুরুজীরে জিগায়েন উনার ‘গুরুজী’ ব্রাণ্ডিংয়ের মূল রূপকার কোন প্রতিষ্ঠান? কোয়াণ্টামের প্রমোশনাল মেটেরিয়াল পুস্তিকা, লিফলেট, পোস্টার, বিজ্ঞাপন, স্পেস ভাড়া, পরবর্তীতে মাটির ব্যাংক, ব্লাড ব্যাংক আর বান্দরবনের লামার প্রজেক্টের মূল স্পন্সর আছিলো কোন প্রতিষ্ঠান? জিগায়েন হোসাইন আল মাসুম ছাড়া মহাজাতক গুরুজী হইবার পারতেন কি না। বাস্তব জীবনে গুরুজীর শিষ্যদের এসব তথ্য জানানোর পরে দেখছি ভীষণ চেইতা ওঠেন, যদিও দাবী করেন যে উনাদের গুরুজী ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’ ফিলোসফি শিখায়া আত্মোন্নয়ন ঘটায়া দিছেন।)

প্রসঙ্গে ফিরি, বিএনপি আমলে রাজনীতি নিরপেক্ষ এনজিও যুবকের জামাতি গন্ধ ঢাইকা রাখা কষ্টকর হইলো। বিভিন্ন তথ্য আর যুবকের এক্টিভিটিজের ঘাটাঘাটিতে ক্রমশ চাউর হয়া গেলো যুবক কামারুজ্জামানের ব্রেইন চাইল্ড। অতি অল্প সময়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যুবকের কার্যক্রম বিস্তারে জামাত মূখ্য ভূমিকা পালন করছে। যুবক হইলো জামাতের এনজিও শাখা। নির্বাহী পরিচালক হোসাইন আল মাসুমসহ পরিচালনা পরিষদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জামাতি। এমতাবস্থায় সর্বসাধারণ বিশেষত আওয়ামীপন্থী মিডিয়া কর্মীদের কাছে যুবক নিজের জামাত সম্পৃক্ততা আড়াল করণের জন্য ভাড়া করলো খাইখাই লীগ আর শুদ্ধতাবাদী বাম। পল্টনের ‘বায়তুল খায়ের’ ভবনের যুবক হেড অফিসে তখন বামকর্মী, বাম ছাত্রনেতা, বাম নেতায় গিজগিজায়। দরজায় বাম, টেবিলে বাম, চেয়ারে বাম, করিডোরে বাম, এমুন কি বাথরুমে ঢুকলে সেখানেও বাম। যুবকের শাখা উইমেন ডেভেলপমেণ্ট ফাউণ্ডেসনের অফিসের টেবিলে টেবিলে এই বিপ্লবী মার্কসরা বইসা থাকেন কর্মহীন। আসলে বইসা থাকাই তাদের কর্ম ও দায়িত্ব, মাসের আটাইশ তারিখে বেতন পকেটে ভরেন। বইসা থাকার জন্য বেতন কেনো– কোনো জিজ্ঞাসা নাই। চোখেমুখে বিপ্লব সম্পাদনের চকচকা আনন্দ।

দেশবরেণ্য একজন বামনেতা নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতেন, আড্ডার তো আর বেতন হয় না। তাই তিনি মোটা অংকের সম্মানী লইতেন। আড্ডার বিনিময়ে সম্মানী নেয়া বামনেতা তখনকার মত এখনো দুর্নীতি, অপরাজনীতি, মৌলবাদ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। টকশোতে আইসা এসবের বিরুদ্ধে আপন অবস্থান আর লড়াইয়ের গল্প শোনান। তার নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক বক্তব্যে হাত তালি দিয়া উঠি। মাগার পাপী হাতে আওয়াজ হয় না। সেইসব ছাত্রনেতাদের কয়েকজন বিপ্লব সাধনে ব্রাক ব্যাংক আর গ্রামীনফোনে ঢুকছে। কয়েকজন ফুলটাইম নবীনদের মার্কস, এঙ্গেলস, চে, লেনিন শেখায়, বিপ্লব ও আপোষহীনতা শেখায়। আর পার্টটাইম তদবির ও সিস্টেমে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাদের লগে মিলামিশা টেণ্ডার বাণিজ্য করে। আর একটা অংশ এখনো অনুতপ্ত হয়া হিসেব মিলাইতে চেষ্টা করে। অর্থাভাবে এক কাপ চা আর বেনসন ভাগভাগি কইরা খাইতে খাইতে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, পাল্টায়া দিবার ইচ্ছায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়।

খ. বাংলাদেশের ধর্মপীরদের লগে বামদের একটা বিশাল মিল আছে। তারা উভয়েই শুদ্ধতাবাদী। সকল পীরদের দাবী শুদ্ধ ইসলাম রক্ষায় তার বিকল্প নাই, বামদলগুলোর দাবীও তদ্রুপ যে তারা ছাড়া শুদ্ধবাম নাই। এই শুদ্ধবাম দল ভাইঙ্গা নতুন নতুন শুদ্ধতম বামদল পয়দা হয়। সেই দলও আবার ভাঙ্গে। যতবাম ততভাগ, বামদল মানেই যেন শুদ্ধ শুদ্ধ খেলা, পল্টিবাজীর শুদ্ধতায় বিপ্লবে অবহেলা। নব্বই পরবর্তী সময় থেকা দেশের বূর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলি পইচা আবর্জনায় পরিণত হইছে। দুর্গন্ধে তিষ্টানো দায়। অন্যদিকে বামদলগুলি পঁইচা গেছে আরো বেশী। কিন্তু এই পঁচন দুইটা কারণে আম-মানুষের নজর এড়ায়া যায়। কারণ মধ্যবিত্ত সমাজ বামদের এখন আর পুছেনা, বরঞ্চ তাগো কাজ কারবার দেইখা মাঝে সাঝে ফিচিক কইরা হাসে। অন্যদিকে শহইরা নিম্নবিত্ত সমাজ বামদলগুলার মহান মহান নেতাদের কথা শুইনা শ্রদ্ধা করে, একধরণের আফসোসবোধে আক্রান্ত হয় ‘আহা রে! এরা যদি একবার ক্ষমতা পাইতো!’

মহাপ্রগতিশীল ও সদা শুদ্ধতাপিয়াসী বামনেতাদের নব্বই পরবর্তী অধিকতর পইচা ডাস্টবিনে পরিণত হওনটা রোধ করা যায়নি। এক ইনু এক মেনু এক মইনুদ্দিন বাদল আদতে একমাত্র নয়, ঐ বয়সী অধিকাংশ বামনেতা আর তাগো ঘণিষ্ট সহযোগিরা মনে মনে ইনু, সুযোগসুবিধা আদায়ে মেনু, হিসাবনিকাশ আর ভোগবিলাসে আদ্যন্ত মঈনু। একথা অস্বীকার করনের উপায় নাই যে আপন নেতারে সর্বোত্তম শুদ্ধতম পীর মানবার সীমাবদ্ধতা আমলে না নিলে ডেডিকেটেড বামকর্মীরা সত্যই মেধাবী, চিন্তাশীল, আপোষহীনতার জোশে বলিয়ান আর ত্যাগ স্বীকারে সদাপ্রস্তুত। অথচ দিনে দিনে পাঠচক্রে আর উন্মুক্ত আলোচনায় তাগো শেখানো হয় ইসলাম বিদ্বেষ মানে প্রগতিশীলতা, ধর্মহীনতা মানে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম যার যার উতসব সবার মানে বিশাল দর্শন, আধখানা মার্ক্স, সিকিখানা লেনিন, দুই চামুচ চে, আড়াই চামুচ ক্রাচের কর্ণেল তাহের, পৌণে তিন গ্রাম শ্রেণি সংঘাত, দুইপাতার শ্রেণিবৈষম্য আর দশপাতা শ্রেণিশত্রু চিনিবার ১০১টি উপায়। আর এসবকে বুকে ধরে সহি বামনেতার নেতৃত্বে দশবস্তা বিশ্ববিপ্লব সম্পাদনের স্বপ্ন।

এমুন সিস্টেমেটিক ব্রেইনওয়াশের ফলাফল হিসেবে একটা শ্রেণি হয় চতুর ধান্দাবাজ আর অন্য শ্রেণিটা শ্রদ্ধাভাজন সাজ্জাদ কাদির ভায়ের স্ট্যাটাসের মতন ‘১৯৬৩-৬৪ সালে যে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কমিউনিজম, নাস্তিক্য, মদ্যপান, বেশ্যাগমন ইত্যাদি সম্পর্কে আমার মতো আরও অনেক কিশোর-তরুণকে উদ্বুদ্ধ করতে চাইতেন কিছু দিন আগে তিনি সেলফোনে একটি দোয়া পাঠিয়ে লিখেছেন, এ দোয়া আরও ১০ জনকে পাঠাও – ৩০ দিনের মধ্যে সুখবর পাবে। না পাঠালে ৩০ বছরেও কোনও সুখবর পাবে না। [১৮.০১.২০১৭]”

গ. হাসানুল হক ইনু আর মেনন ক্ষমতার ভাগীদার হবার পরে হজ্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি হজ্ব পালন করেছেন সিপিবির মঞ্জুরুল আহসান খান। আল্লাহ তাদের হজ্জ কবুল করুন। তবে সাধারণ মানুষ বিশেষত তরুণদের মধ্যে এই তিনজনের হজ্জ পালনের সংবাদে হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে হজ্জ পালন লয়া হাস্যরসের হেতু কি! ইনু আর মেননও প্রগতিশীলতার অর্থ শিখাইছিলেন ইসলাম বিদ্বেষ, অসাম্প্রদায়িকতার অর্থ শিখাইছিলেন ধর্মহীনতা আর কমিউনিস্ট ও সোশ্যালিস্ট মানে শিখাইছিলেন নাস্তিক। তাদের এই মহানবোধের তাড়নাতেই তারা খাইখাই সরকারের অংশ হইছিলেন। হোক না খাইখাই, সরকার সেক্যুলার তো। এই সেক্যুলার সরকারের মদিনা সনদের বাংলাদেশ বাস্তবায়নে হজ্জের সার্টিফিকেট অপরিহার্য হয়া পড়ায় ইনু-মেনু সুরসুর কইরা আপন শিক্ষা ভুইলা হজ্জের সার্টিফিকেট অর্জন কইরা আনছেন। তাদের এই হঠাত ধর্মবোধ চাগায়া ওঠায় আর তাগো অনুসারীদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় না হাইসা উপায় আছিলো না। মঞ্জুরুল আহসান খানের হজ্জও হাসির উদ্রেক করছে, কারণ পার্টিগতভাবে তারাও একই পথের পথিক আছিলেন। তার অনুসারীরা পাঠ্যপুস্তকে ‘রামায়ণ (আদিকাণ্ড)’তে সাম্প্রদায়িকতা খুঁইজা না পাইলেও ও-তে ওড়নায় বিশাল সাম্প্রদায়িকতা খুইজা পাইছিলেন। অকস্মাৎ তিনি ও-তে ওমরাহ হজ্জ কইরা আপন অনুসারিদের ক-তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ফাসায়া দিছেন। মঞ্জুরুল আহসান খানের হজ্জ করণের টাইমটা আমার পছন্দ হইছে। নির্বাচনের দুই বছর বাকী। নির্বাচনরে কেন্দ্র কইরা জোট গঠন আর নির্বাচিত হইলে মন্ত্রীত্ব কনফার্ম করণের ক্ষেত্রে এই আগাম ওমরাহ হজ্জ পুরাই জিপিএ ফাইভ পাওনের সুবিধা দিতে পারে। আগামী সংসদে আর খাইখাই সরকারের উন্নয়নের বাংলাদেশ গড়ার নিবেদিত মন্ত্রী হিসেবে খান সাহেবরে দেখলে অবাক হমুনা।

ঘ. ভাষা আন্দোলন থেকা শুরু কইরা স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন থেকা শুরু কইরা নব্বই আন্দোলন পর্যন্ত আন্দোলন সংগঠক, পরিচালন, বেগবান করণের প্রধান দায়িত্ব পালন করছে বামরা। প্রতিবার নিজেগো আঁতলামী আর জ্ঞানগরিমার তত্ত্বের ক্যাচাল সুযোগ বুর্জোয়া দলগুলিরে সুযোগ কইরা দিছে সেইসব আন্দোলনরে দখল করণের। অবশ্য বামনেতাদের অনেকেই হালুয়া-রুটি আর আপন আখের গোছাইতে আন্দোলনরে বুর্জয়া দলগুলির হাতে তুইলা দেওনের জন্য গোপনে তৎপর আছিলেন। এসব গোপন কোনো ব্যাপার না। নব্বই-এর থেকা বামদলগুলি পুরাই নাদান আর লীগপন্থী, লীগের প্রতি তারা সকল প্রেম সকল রাগ সকল অভিমান সকল আশা নিয়া আকুল হয়া গায়া যাইতাছে ‘হাত ধরে নিয়ে চলো সখা, আমি যে পথ চিনিনা..।’

আফসোস, হিপোক্রেসি আর পইচা যাওয়া নেতাদের বাদ দিলে একতাবদ্ধ বাম যে এইদেশে অসাধ্য সাধন করতে পারে, পুরা রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর দেশরে বদলায়া দিতে পারে সে কথা আম-বামরা বুঝে না। বুঝলেও পীরের মুরিদানা খারিজের ঝুঁকিতে যাইতে চায় না। ঝুঁকিতে যাইতে চাইলেও দীর্ঘদিনের শুদ্ধতার সংস্কৃতির বোধ জাইগা ওঠে। আবার শুরু শুদ্ধতা শুদ্ধতা খেলা, ভাঙন ও পচন চক্র। আদতে সব জাইগা ওঠা তো আর ভালো না। তবে কয়া রাখলাম, এইদেশে ইতিবাচক রাজনীতির পরিবর্তন যদি কোনোদিন আসে তবে ফ্রেশব্লাডের বামদের একতাতেই আসবো, আর সেটা ইসলাম বিদ্বেষের পরিবর্তে ৯০% নাগরিকের ধর্মবোধরে স্বীকার কইরা, নচেৎ নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও এক্টিভিস্ট।


নতুন কাগজ | news editor

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন