Natun Kagoj

ঢাকা, রবিবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৯শে সফর, ১৪৩৯ হিজরী

একটি অরাজনৈতিক গল্প

আপডেট: ০৫ সেপ্টে ২০১৭ | ১৭:৫৭

 নিবেদিতা রায় :   গল্পটা কাল্পনিক নয়। চরিত্র ও ইতিহাস নিজ জীবনের। স্থান আমার মফস্বল শহর। সময়কাল ছেলেবেলা। তখন ১ম শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের স্কুলে যাবার পথে মেথর পট্টি ছিল। একদিন দেখলাম ওই পট্টিটা উঠিয়ে দিয়ে নতুন কিছু করার আয়োজন চলছে।সমাজের নিচু শ্রেনির ওই আবাস কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছিল জানি না কারন নতুন ভাবে ওই জায়গাটায় কী হবে সেটাই ছিল আমার কৌতুহল।

মাটি ফেলে জায়গাটা সমান করা হবে। ইট আসছে, বালু ফেলবে। বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ওই জায়গাটা শিশুপার্কের জন্য নির্ধারন করা হয়েছে। কি ভীষন খুশি হয়েছিলাম। আমাদের শহরের এক প্রান্তে সরকারি স্টাফ কোয়াটারে একটা শিশুপার্ক ছিল বটে তবে, তা বোধকরি সরকারি অফিসার আর কর্মকর্তাদের শিশুদের জন্য করা হয়েছিল। কারন ঐ এলাকায় অনান্য নাগরিক যাতায়াত খুব কম ছিল। যাইহোক আমার বন্ধুরাও খুব খুশি হয়েছিল শিশুপার্কের রাইডগুলো কল্পনা করে। আমরা প্রতিদিন স্কুল যাবার পথে চেয়ে চেয়ে দেখতাম আর অপেক্ষা করতাম…কবে শেষ হবে কাজ? আর কত বাকী? ২য় শ্রেণিতে উঠে দেখলাম সবেমাত্র বালু এসেছে, আরো পরে ইট।

এভাবে ৩য়, ৪র্থ শ্রেণি, একদিন স্লিপার, ঢেঁকি, দোলনাও দেখতে পেলাম। আমাদের মনে তখন আনন্দের ফোয়ারা, এইবার বোধহয় শিশুপার্কের দোলনায় দোল খাওয়া হবে। তারপর একদিন হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে গেলো। কী হয়েছিল জানি না, কার কাছে জানতে চাইবো তাও জানি না। আমাদের মন খারাপ অভ্যাসে পরিনত হতে হতে আশাটাই মরে গেলো।

এবার অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, একদিন দেখা গেলো আবারো কাজ শুরু হয়েছে। আগাছা পরিষ্কার, গাছ লাগানো ইত্যাদি ইত্যাদি। অবোকাঠামোগত কাজের শেষ হতে হতে আমরা তখন কলেজে। আমরা তখন আঠারো, আমরা তখন শিশু বয়সটা মাত্র পেরিয়েছি কিংবা বলা ভালো স্লিপারে উঠে হাত-পা ছুঁড়ে আনন্দ করাটা তখন বড় লজ্জার। কলেজে যেতে যেতে আমরা দেখতাম কল্পনার ঢেঁকিতে আমাদের শৈশব বসে আছে, ছুটোছুটি করে লুটোপুটি খাওয়া বাচ্চারা আমাদের ছোট ভাইবোন। অবশেষে আমরাও ওই স্বপ্নের শিশুপার্কে গিয়েছিলাম। দোলনায় দোল খেতে নয় মাঠে বসে বাদাম খেতে খেতে শিশুদের আনন্দ মেলার সাক্ষী হয়েছিলাম।

এভাবে শিশুপার্কটা শুরু হলো, বেশ কিছুদিন বাচ্চাদের হৈ হৈুল্লরে মুখরিত ছিল। ঈদ, পুজা উৎসবে বিনোদনের অন্যতম আশ্রয় ছিল। কিন্তু সেখানে আরো একদল মানুষের যাতায়াত আরম্ভ হলো। যারা শিশু নয় তাই অবুঝ নয়। আার তাই জেনেবুঝেই ফেন্সিডিল, মাদকের আসর বসাতে ওই শিশু উদ্যানটাই বেছে নিল। আমরা যারা কলেজ শেষে বাদাম খেতে অথবা ঘুরতে যেতাম তাদের জন্যই শুধু জায়গাটা নিষিদ্ধ হলো না ধীরে ধীরে শিশুদের আসাও কমতে শুরু হলো। এখনো ওই শিশুপার্কটি রয়েছে তবে, শিশুরা নেই, আগাছা আর অযত্নে সবকিছু কেমন ভুতুরে একটা পরিবেশে পরিনত হয়েছে। যে উদ্যানটি পরিনত রূপে সাজতে এতোটা লম্বা সময় পারি দিল সেটার পরিনতি মনেহলো আরো খারাপ হলো। তবে অদ্ভূতুড়ে ওই মানুষগুলোর জন্য এই পরিবেশটাই বেশি মানানসই তাই হয়তো এসব নিয়ে ফালতু চিন্তা করে সময় নষ্ট করার সময় কারো নেই!

অনেক পুরোনো এই গল্পটা কী শুধু আমার শহরেই ঘটে যাওয়া একটা শিশুর মনোকষ্টের ইতিহাস! আজ তবে, এতো কথার কারন কী! এ কারনেই জাবর কাটা যে, মাত্র এক বছর পরে আর একটি নির্বাচন। অনেকেই ভোটযুদ্ধে অবতীর্ন হবেন, ভোট চাইবার সময় মধুর মধুর কথা বলবেন, স্বপ্ন দেখাবেন, সরকারী প্রশাসনে দায়িত্বে থাকা বিরাট বিরাট মেধাবী ক্যাডাররা বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন। আমরা ট্যাক্স দেবো। এভাবেই চলতে থাকবে।
আমাদের ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নতে ভবিষ্যত প্রজন্মকে দেখতে চাই না। উন্নয়ন কিছু হয় নি তা বলবো না। তবে, সেই উন্নয়নের গতি আর পরিনতি যদি এই গল্পের মতো হয় তবে, ভাবনাতো এসেই যায়। যেখানে সময় অসময়ের হাত ধরে চলে তাতে মরিচিকার খোঁজে শুধুই ছুটে বেড়ানো। একটা সময় মরিচিকা সত্য হলেও তাতে আর কৌতুহল থাকে না। তখন আমার ১ম শ্রেনি কলেজ মাঠের নির্বাক দর্শক।

 

  লেখক : নিবেদিতা রায় – সহকারী অধ্যাপিকা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

 


নতুন কাগজ | এডমিন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন