Natun Kagoj

ঢাকা, রবিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৩রা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

আসলেই কী বিএনপি পরিবারতন্ত্রে আবদ্ধ ?

আপডেট: ১১ আগ ২০১৬ | ১৪:৪০

BNP Monogram

এইচ এম জালাল আহমেদ ।। রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবারতন্ত্র। এ জিকির তুলে ঝড় বইয়ে দিচ্ছে মহল বিশেষ। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি নিয়েই সমালোচনাটা একটু বেশী হয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জুলাইয়ের শুরুতে দলের স্থায়ী ও নির্বাহী কমিটির কয়েকটি পদ ফাকা রেখে পুর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে। বিএনপির পুর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর থেকেই পরিবারতন্ত্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে বলে অনেক মহলেই সমালোচনায় ঝড় বইছে। তারা বলছেন, কমিটিতে থাকা বিএনপির অনেক নেতার স্বজনরা স্থান পেয়েছেন। বিএনপির সদ্য ঘোষিত নির্বাহীসহ বিভিন্ন কমিটিতে বড় বড় নেতাদের স্বজনেরা দখল করে নিয়েছে। অবশ্য বিএনপির সদ্য ঘোষিত পুর্ণাঙ্গ কমিটিতে অনেক নেতার স্বজনেরা স্থান করে নিয়েছেন। যদিও সমালোচকেরা সমালোচনা করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তারপরও বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা যে কথা বলছেন তাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তারা বরছেন, শুধু বিএনপিতেই পরিবারতন্ত্র ঢুকে পড়েনি অন্যান্য দলেও একই পরিবারের অনেকেই রাজনীতি করছেন। বলতে গেলে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলেই কথিত পরিবারতন্ত্র রয়েছে। বিএনপির ঘোষিত কমিটিতে যে সব নেতাদের সন্তান এবং স্বজনেরা স্থান পেয়েছেন, তারা সবাই পরিবারের্ উর্ধ্বে উঠে রাজনীতি করেই দলে যে কোনো কমিটিতে স্থান পাবার যোগ্যতা অর্জন করেছে বলেই ঘোষিত কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। এ কারনেই তাদের প্রশ্ন সমালোচনাকারীদের কাছে আসলেই কী পরিবারতন্ত্রে আবদ্ধ পড়ছে বিএনপি?

সমালোচনাকারী মহলগুলো বলছেন, তাবিথ আউয়াল, শামা ওবায়েদ, মীর হেলাল, খন্দকার মারুফ হোসেন, অপর্ণা রায়, মির্জা ফয়সাল আমিনসহ প্রায় এক ডজনের বেশী সদস্য বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অনুমোদিত নতুন কমিটিতে দলটির নেতাদের পরিবারের স্বজনেরা স্থান পেয়েছেন। কাউন্সিলের সাড়ে ৪ মাস পর গত ৬ আগষ্ট শনিবার নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ৫০২ সদস‌্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চেয়ারপারসন পদে বেগম খালেদা জিয়া এবং জ‌্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম‌্যান পদে তার ছেলে তারেক রহমান কাউন্সিলেই নির্বাচিত হন। কাউন্সিলের কয়েক দিন পরে মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মহাসচিব ঘোষণা করা হয়। তারপর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা হয়, তাদের মধ‌্যে ছিলেন দলের সাবেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ। গত ৬ আগষ্ট শনিবার স্থায়ী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, ভাইস চেয়ারম‌্যান, সম্পাদক মণ্ডলী ও কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস‌্যদের নাম ঘোষণার পর দেখা যায়, দলের পদে থাকা নেতাদের পরিবারের সদস্যরা এক ডজনের বেশি নানা পদ পেয়েছেন। যুদ্ধাপরাধে মৃত‌্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস‌্য হয়েছেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রয়াত যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমকেও। অবশ্য ঘোষিত কমিটিতে তাদেরকে স্থান দেয়ার যৌক্তিকতা ব‌্যাখ‌্যা করেছেন, দলের মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘যার যতোটুকু যোগ্যতা  একটি সংগঠনের জন্য থাকা প্রয়োজন, প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।” বিশাল নির্বাহী কমিটির ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, “বিগত দিনগুলোতে বিএনপি যে বিকাশ লাভ করেছে, বিশেষ করে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী নেতা-কর্মীর সংখ্যা বেড়ে গেছে, ছাত্রদল-যুবদল থেকে যারা আসছেন, তাদেরকে তৈরি করার জন্য নতুন কমিটিতে আনতে হয়েছে।”

বিএনপির মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন নতুন কমিটিতে সদস‌্য হয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। ফখরুলের ভগ্নিপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন‌্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য। তাদের পরিবারের আরেকজন এবার কমিটিতে পদ পেলেন। শামা ওবায়েদ মির্জা ফয়সাল আমিন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছোট ছেলে সুপ্রিম কোর্টের নবীন আইনজীবী খন্দকার মারুফ হোসেন এবং আগের স্থায়ী কমিটির সদস‌্য যুদ্ধাপরাধে মৃত‌্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী কার্যনির্বাহী সদস‌্য হয়েছেন। যুদ্ধাপরাধে মৃত‌্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদেরের ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী কমিটিতে ভাইস চেয়ারম‌্যানের পদ পেয়েছেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস‌্য মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। তিনি তারেক রহমানের আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী স্বামীর প্রচারে নেমে সাড়া ফেলেছিলেন তিনি। আফরোজা আব্বাস তাবিথ আউয়াল মির্জা আব্বাসের ছোট ভাই ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মির্জা খোকন কার্যনির্বাহী কমিটির সদস‌্য পদ পেয়েছেন। ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল কার্যনির্বাহী সদস‌্য হয়েছেন। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে ঢাকা উত্তরে মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন বাফুফের সহসভাপতি তাবিথ। স্থায়ী কমিটির সদস‌্য তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ ইসলাম অমিতকে সহ সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়কে প্রান্তিক ও জনশক্তি উন্নয়ন বিষয়ক সহ-সম্পাদক করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। গয়েশ্বরের পুত্রবধূ নিপুন রায় চৌধুরীও পদ পেয়েছেন, তিনি কার্যনির্বাহী সদস‌্য হয়েছেন। নিপুন ভাইস চেয়ারম‌্যান নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে। বন্দি অবস্থায় মারা যাওয়া নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আখতার কল্পনাকে কার্যনির্বাহী সদস‌্য করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। খন্দকার মারুফ হোসেন মীর হেলাল উদ্দিন ভারতে বিচারের মুখোমুখি থাকার মধ‌্যেও স্থায়ী কমিটিতে আসা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস‌্য হাসিনা আহমেদকেও রাখা হয়েছে নির্বাহী সদস‌্য হিসেবে। সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনাকে নিজের উপদেষ্টা পরিষদে আরও ৭২ জনের সাথে রেখেছেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। স্থায়ী কমিটির সদস‌্য রফিকুল ইসলাম মিয়ার স্ত্রী সাহিদা রফিক উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পেয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর সাথে তার মেয়ে আফরোজা খান রীতাও উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন। রীতা আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের শ‌্যালিকা।

আন্তর্জাতিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন অসীম উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নানের মেয়ের জামাই। প্রয়াত হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরীকে নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুকে এবারও নির্বাহী সদস্য পদে রেখেছেন। অপর্ণা রায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে। নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনাকে উপদেষ্টা পরিষদে রেখেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সাবেক শিল্পমন্ত্রী প্রয়াত এম শামসুল ইসলাম খানের ছেলে মইনুল ইসলাম শান্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হয়েছেন। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ সহ-তাঁতি বিষয়ক সম্পাদক পদ পেয়েছেন। সাবেক গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের ভাই আনোয়ার হোসেন বুলু নির্বাহী সদস্য হয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ নাসের রহমানকে সদস‌্য পদে রাখা হয়েছে। দলের ভাইস চেয়ারম‌্যান মীর নাছির উদ্দিনের ছেলে মীর হেলাল উদ্দিনও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস‌্য হয়েছেন। আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রয়াত যুদ্ধাপরাধী ও বিএনপি নেতা আবদুল আলীমের ছেলে ব‌্যবসায়ী ফয়সাল আলীমও পেয়েছেন দলের সদস্যপদ। তিনি উইনটেল লিমিটেডের ব‌্যবস্থাপনা পরিচালক। ২০ দলীয় জোটের শরিক ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) এর প্রয়াত সভাপতি অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারাহানাকে সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

পরিশেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারো কারো বিশ্লেষণ ও উপরোক্ত সমালোচনাসহ বিএনপির পেক্ষ থেকে ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করলে অনেকটাই পরিস্কার হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। বিএনপির ব্যাখ্যা একেবারেই পরিস্কার। আসলেইতো বিএনপির বিভিন্ন নেতার স্বজনেরা বিএনপির ঘোষিত কমিটিতে যারা স্থান পেয়েছেন, তারা কেউই হুট করে দলে স্থান করে নেননি। এমনকি তারা তাদের কোনো স্বেজনের পরিচয়েও পদ পদোবি পাননি। সবাই অনেক বছর ধরেই বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তারা রাজনৈতিকভাবে দলের সাথে জড়িয়ে থেকেই যোগ্যতার ভিত্তিতে দলের প্রয়োজনীয় পদে স্থান পেয়েছেন। তাদেরও সমালোচকদের কাছে প্রশ্ন রাজনৈতিক কোনো বিধানে কোথাও কী লেখা রয়েছে কোনো রাজনৈতিক নেতার স্বজনেরা রাজনীতি করতে পারবেন না? যোগ্যতা বলে রাজনৈতিক দলে স্থান পাওয়াটা কী অপরাধ? সব দলে নেতাদের স্বজনেরা জড়িয়ে রয়েছেন। বিএনপিতে কোনো নেতার স্বজনেরা স্থান পেলেই সমালোচনার ঝড় ওঠছে কেন? এভাবে অনেক প্রশ্ন রয়েছে এসব তরুন নেতা নেত্রীদের। প্রশ্ন করলে হাজারো প্রশ্ন করা যায়। আবার সমালোচনা করলেও অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু যেখানে সমালোচনা করার কথা সে বিষয় নিয়ে কেউই টু-শব্দটি করছেন না। পরিবারতন্ত্রের চেয়ে সমালোচনার বিষয় রয়েছে দলের ভেতর কারা ঢোকছেন এবং তাদের কর্মকাণ্ড কী। যাদের নিয়ে সমালোচনা হবে তারা কোনো রাজনৈতিক দলে স্তান পেলে দর ও দেশের জন্য কী কী ক্ষতি, তা তুলে ধরা প্রয়োজন। বিএনপির ঘোষিত কমিটিতে এমন কোনো ব্যক্তি স্থান পেয়েছেন কীনা, যদি পেয়ে থাকেন তাহলে তিনি কে বা কারা। তাদের আসল পরিচয় কী এবং তারা কেন দল ও দেশের জন্য সম্মানজনক নয়। এ সব বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হতেই পারে এবং চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে চিহ্নি করা উচিত। কিন্তু ঢালাওভাবে বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতার দৃষ্টিতে সমালোচনা করা কতোটা সমিচিন, তাও হয়তো ভেবে দেখবেন যে সমহল সমালোচনা করছেন। তারাও খোজ নিয়ে দেখতেই পারেন, তাদের ঢালাও সমালোচনায় সাধারন নাগরিকেরা কী ভাবছেন এবং বলাবলি করছেন। সাধারন নাগরিকদের মধ্যেও প্রশ্ন ওঠছে আসলেই কী পরিবারতন্ত্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে বিএনপি?


নতুন কাগজ | জহিরুল ইসলাম

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন