Natun Kagoj

ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ | ১ পৌষ, ১৪২৪ | ২৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯

আশির দশকের ছোটবেলা

আপডেট: ১৬ এপ্রি ২০১৭ | ১৯:৪৫

আশিকুজ্জামান টুলু

মেট্রিক পরিক্ষা শেষ, এখন  কিছু তো একটা করতে হবে । পরীক্ষার সময় কতকিছু যে মাথায় আসে -কোনো ইয়ত্তা নাই, মনে হয় কত কিছু করবো। কিন্তু যেই পরীক্ষা শেষ হয়, আর কোন কিছুই মনে থাকেনা এবং করারও আর কিছু থাকেনা। ৬ বন্ধু প্ল্যান করলাম যেভাবেই হোক চিটাগং ও কক্সেস বাজার যেতেই হবে– তা না হলে জীবন বৃথা হয়ে যাবে । ৪০০ টাকা করে চান্দা । আমরা ৬ জন, ২৪০০ টাকা । হেসে খেলে হয়ে যাবে । সবাই বাগড়া দিলো, কারো পক্ষে ৪০০ জোগাড় করা সম্ভব না, ম্যাক্সিমাম ২৫০ পর্যন্ত সম্ভব । বন্ধু সেলিম বলে উঠলো-
কোন অসুবিধা নাই, ২৫০ই সই, আমরা এই ২৫০ টাকা দিয়াই ঘুইরা আসতে পারুম কক্সেস বাজার পর্যন্ত, শুধু চিটাগং এ আমার মামার বাড়ি থাকুম একদিন, তাইলে ওইখানে কিছু টাকা বাইচা যাইব । সবাই সেলিম এর কথায় রাজী হয়ে গেলাম । রাজী না হয়ে অবশ্য কোন উপায়ও ছিলোনা ।

আম্মার সাথে ঘাই-ঘুই করে ২৫০ টাকা নিলাম । মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি, পাতলা মোচ হয়েছে, ঠিকমত দাড়ি হয় নাই । বুকে লোম খুবই প্রয়োজন, আর তা না হলে কিসের পুরুষ! আমাদের মধ্যে একমাত্র শিবুর বুকে চাইরটা লোম আছে, তাও আবার ফেউয়া। অর্থাৎ সেরকম পুরুষালী চুল না, ছোটোদের চুল। আসলে বুকের চুল না বলে বরং মনের ভুল বললেই মানায় বেশী । তাই নিয়েই ওর গর্বের শেষ নাই। আমরা সকাল বিকাল রেজার দিয়ে নিয়মিত বুক, পা সব শেভ করে যাচ্ছি কিন্তু লোমের দেখা নাই, কি যে করি!!

মেয়েদের সামনে যেয়ে বুকের বোতামটাও খোলা যায়না, একমাত্র শিবু সাহসিকতার সাথে বুকের বোতাম খুলে রাখে, কি ভালো লাগে ওকে, একেবারে রাজেশ খান্নার মতো । রাজেস খান্না কত লাকি, ওর বুকে কত লোম। একারনেই শিবু আমাদের মধ্যে মেয়েদের কাছে প্রথম পুরস্কার পেয়ে গিয়েছে বলে আমাদের ধারনা । এছাড়া মেয়েদের কাছে ম্যানলি হওয়ার জন্য যা যা দরকার সব শিখতে চেষ্টা করছি, যেমন সিগারেট খাওয়া, মদ খাওয়া, মাঝে মাঝে গাঁজা । সবই শিখতে চেষ্টা চালাচ্ছি, কোনটা লেগে যাবে সেটাতো এখনও জানিনা, অর্থাৎ এখনও তো মেয়ে সংসর্গে যাই নাই । এই বদ গুনগুলি যদি রেডি রাখা যায় তাহলে সঠিক সময়ে কাজে লেগে যাবে ।

আমাদের এক বন্ধু ছিল, কোথাও গিয়ে মেয়ে দেখলেই মন খারাপ এবং প্রচুর সিগারেট খাওয়া দেখাতো । মনে মনে ভাবতো “এসব দেখে যদি মেয়েটা এসে জিজ্ঞাসা করে” – “তোমার এতো দুঃখ কিসের!”  ব্যাস, তাহলেইতো কর্ম সাবাড়, গরুরে নদিতে ফালায়া নদি রচনা লেইখা দিবো । ওরে আমরা অনেক কইসি “ঐ ব্যাটা, মাইয়া দেখলেই অমন দুঃখ দুঃখ ভাব দেখায়া মুড মারস ক্যান?”
ও কিছু বলতো না । পরে বড় হওয়ার পর বুঝলাম ওইটা ছিল ওর “প্রেম করার দুঃখ জাগানিয়া টেকনিক” অর্থাৎ হিন্দিতে “ইমোশনাল আত্তিয়াচার” ।

যাত্রার দিন চলে এলো । মজা আসলে আগের দিন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো, অর্থাৎ আগের দিন রাতেই আমরা পজিশন নিয়ে নিলাম শিবুর বাসায় । সকাল ছয়টায় বাস । পৌঁছে গেলাম বাস স্ট্যান্ডে, টিকেট কেটে উঠে পড়লাম বাসে । আমাদের আরেক বন্ধু সেলিম বললো, চিটাগং এ আমরা একদিন থাকবো এবং এই একদিন আমাদের ওর মামার বাসায় থাকতেই হবে, মামা আগেই অনেক করে বলে দিয়েছেন । আমরা ভাবলাম একদিনের হোটেল ভাড়া এবং খাওয়ার খরচ বেচে যাবে, খুব উত্তম প্রস্তাব । সবাই এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম । বাসে উঠে আমরা তিনজন মাঝামাঝি ডান পাশের তিনজনের সিটে বসলাম, আমাদের বাম পাশে আমাদের আরও দুজন ফ্রেন্ড দুজনের সিটে বসলো । শিবু ঠিক আমাদের সামনের সিটের মাঝের সিটটায় বসলো । আমাদের বদির আওয়াজে বাস সরগরম হয়ে উঠলো, সবাই বুঝে গেলো “এখন যৌবন যার, মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়”। কেউ আর কোন সাড়া শব্দ না করে বসে রইলো, আমাদের হই চই তো আর কমেনা । ইতিমধ্যে বাস ছেড়ে দিলো ।

কমলাপুর স্টেশনের অপজিটে বি আর টি সি বাস স্ট্যান্ড থেকে রওনা দিয়ে ধীরে ধীরে নটরডেম কলেজ হয়ে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের দিকে এগোতে থাকলো । চোখে পড়লো ভোর বেলার শুভ্র সুন্দর ঢাকা শহর । একটা দুটো রিকশা প্যাসেঞ্জার ছাড়া টুং টাং করে ধীর গতিতে এগোচ্ছে । বাস মধুমিতা সিনেমা হলকে বায়ে রেখে গোপিবাগে এসে ডানে ঘুরে ইত্তেফাকের মোড়ে এসে বায়ে ঘুরলো । দেখলাম কোন কোন দোকানের ঝাপ কেবল খুলে সামনের ফুটপাতে দাড়িয়ে মিসওয়াক করছে, কাঁধে একটা গামছা, পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি । ফুটপাথের ধার ঘেঁষে পাগল প্রকৃতির দুয়েকজনকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম, কেমন যেন নিশ্চিন্ত এই চালচুলোবিহীন লোকগুলো । রাতে যখন কোলাহল কমে যায়, ঘুমিয়ে পড়ে রাস্তার ধার ঘেঁষে । অভিসার হলের সামনে দেখলাম এক মাঠাওয়ালা বসে বসে মাঠা বিক্রি করছে, ডান হাতে ছোট্ট একটা মগে মাঠা ভরে বেশ উঁচুতে শূন্যে উঠিয়ে বাম হাতে ধরা কাঁচের গ্লাসের মধ্যে ঢালছে, আবার ঠিক সে ভাবেই বাম হাতের গ্লাসটা উপরে উঠিয়ে ডান হাতের ছোট মগে ঢালছে । ও আসলে মিক্স করছে মাঠাটা সামনে দাড়িয়ে থাকা টুপি পরা এক কাস্টমারের জন্য । ঐ টুপি পরা লোকটা হয়তো নামাজ পড়ে ফিরছে বাসায়, যাওয়ার আগে একটু মাঠা খেয়ে নিলো । ঐ মাঠায় আবার একটু মাখন দেয়া হতো, হাতে বানানো খাঁটি মাখন, কোনো ভ্যাজাল নেই । তখন মানুষও ছিল খাঁটি তাই মাখনও ছিল খাঁটি । কেউ কেউ আবার মাঠা খেতো না, শুধু মাখন খেতো । আমার খুব পছন্দ ছিল মাখনটা । হয়তো আর কোনদিনও ঐ ভোরবেলার খাঁটি মাখন, ঐ মাঠাওয়ালার কাছ থেকে খাওয়া হবেনা ।

এসব দেখে মনটা কেমন যেন হয়ে গেলো । আমাদের চ্যাঁচামেচি কমে গেলো । সবাই কেমন যেন নীরব হয়ে গেলাম । বাস চলতে থাকলো । স্বামীবাগ, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী একে একে সব পেরিয়ে বাস খুব জোরে চলতে শুরু করলো । সবাই ঝিমাতে ঝিমাতে কুমিল্লার কাছে পৌঁছে গেলাম । কুমিল্লায় কিছুক্ষণ ব্রেক নেয়ার পর বাস আবার চলতে শুরু করলো । আমি হটাৎ খেয়াল করলাম যে আমার সামনের সিটে বসা ভদ্রলোক, অর্থাৎ যিনি শিবুর পাশে বসে ঝিমাচ্ছেন, এক ছড়া কলা (এক ডজন হবে) ঝুলিয়ে রেখেছেন ওনার সিটের পিছনের রডটায়।

ঐ কলাগুলি ঠিক আমার সামনেই ঝুলছে । সাগর কলা, প্রতিটা প্রমান সাইজের, একেবারে পাকা । বড় কষ্ট হতে থাকলো, ইচ্ছা করলো কলাকে আলিঙ্গন করতে । হটাত মনে পড়ে গেলো, যখন খুব ছোট ছিলাম, একটা গানের কথা আমাকে খুব বাগ করতো আর সেটা হলো “ভাবী যেন লাজুক লতা, ছলা কলা কিছুই জানেনা” । আমার ছোট মনের প্রশ্ন ছিল “কলাকে আবার জানার কি আছে, কলা তো খাওয়ার জিনিস” ।

ফিরে আসি আবার সেই কলায়, পারলাম না, আমি পারলাম না । খুব সমর্পণে একটা কলা ছিড়ে গলধকরন করে ফেললাম । আমার একটা চেষ্টা ছিল যে বন্ধুরা যাতে না দেখে । কিন্তু কোন কাজ হলো না। পাশে বসা বন্ধু দেখে ফেললো এবং আমার মতো ও একটা ছিঁড়ে খাওয়া শুরু করলো । ওর দেখাদেখি আমার ডান পাশের বন্ধুটাও নিলো একটা । আমার ভয় করতে লাগলো। ৩ টা খাওয়া শেষ, বাকি আছে ৯ টা । কাদের সাথে যে বন্ধুত্ব করেছিলাম জানিনা, সবগুলি অমানুষ। আমার বাম দিকের সিটে বসা দুইজন নিজের মনে করে টপা টপ দুইটা ছিঁড়ে নিয়ে আয়েশ করে খেতে থাকলো । আমি বললাম-
: এইটা কি ধরনের অভদ্রতা? সমানে কলা খাওয়া শুরু কইরা দিসস?? আশ্চর্য!!!

এদিকে সামনের ঐ ভদ্রলোকতো ঘুমে সাত আসমান পার হয়ে স্বর্গের দিকে চলে গিয়েছেন ।
আমার কথা শুনে ওরা বলল-
: এইসব বালছালের কথা কইস না, ইচ্ছা হইলে তুই আরও ল ।
: ঐ ব্যাটা, মুখ খারাপ করস ক্যান, আসে পাশে লোক আছে তো ।
: ওরে বাপরে, উনি আইসে!! লগে লইয়া ঘুর্তেও পারস, তাতে কিছু হয়না আর আমরা মুখে কইলেই দোষ ।

কথা না বাড়িয়ে আরেকটা কলা নিলাম। কারন যে স্পীডে ওরা খাওয়া শুরু করেছে তাতে হয়তো একটু পরে খেতে চাইলেও ভাগে পাবনা । এদিকে দেখলাম সামনের লোকটা ঘুমে বারবার শিবুর ঘাড়ে পড়ে যাচ্ছে, আর শিবু ওনার গালে হাত দিয়ে ঠ্যালা দিয়ে সোজা করে দিচ্ছে। একটু পরে আবারও লোকটা ওর ঘাড়ে এসে পড়ছে এবং শিবু একই কাজ করছে । শিবু কিন্তু বুঝতেই পারে নাই যে আমরা কলা ঝাড়া শুরু করেছি এবং ইতিমধ্যে জীবন থেকে বেশ কিছু কলা বিদায় নিয়েছে । আরও ঘণ্টাখানেকের ব্যাবধানে দেখলাম যে ১১ টা কলা খাওয়া শেষ, বাকি আছে শুধুমাত্র একটা । ঐ একটা মাত্র ঝুলন্ত কলার কান্না দেখে ভীষণ ভয় লেগে গেলো । ভয় আরও একটু কম লাগতো যদি শিবু হটাত ঐ ঘটনাটা না ঘটাতো । বার বার শিবুর ঘাড়ে লোকটা পড়ে যাচ্ছিলো বলে শিবু খুব বিরক্ত হয়ে উঠেছিলো, একবার দেখলাম শিবু লোকটাকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সোজা করে দিলো, লোকটা সোজা হয়েই ঘুমাচ্ছে । হটাত শিবু ঘুমের ভান করে ভীষণ জোরে লোকটার কাঁধে গিয়ে পড়লো । লোকটা বাবাগো বলে চিৎকার করে উঠলো, আমরা সবাই চমকে গেলাম । আসে পাশের লোকজনও ঘুম থেকে উঠে পড়লো চিৎকার শুনে । শিবুকে বলতে শুনলাম-
: এতো কইতাসি ঘাড়ে পইড়েন না, কথাই শুনেন না মিয়া । বার বার একই কাম করতাসেন । লোকটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে নাই কি হয়েছে । লোকটা ব্ল্যাঙ্ক দৃষ্টিতে শিবুর দিকে তাকিয়ে । আমরা একটু শিবুকে বকা দিয়ে পরিস্থিতি সামলে নিলাম । এদিকেতো আমাদের গলা শুকিয়ে গিয়েছে, যেহেতু কলা মোটামুটি শেষ, শুধু একটা ঝুলছে এবং কলাগুলির মালিকের সাথে শিবু এরকম একটা বেয়াদবি অলরেডি করে ফেলেছে । আমরা আর কলার দিকে তাকাই না, এমন একটা ভাব করছি যে কলা বলে পৃথিবীতে কিছু নেই, কলা বলে কিছু নেই, কিছু নেই, হাজার কলার মাঝে প্রশ্ন রেখে…………।

লোকটা মোটেই জানেনা যে ওনার কলা ইতিমধ্যে স্বর্গে চলে গিয়েছে, একটা শুধু পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে ঝুলে ঝুলে । আমাদের ৫ জনের ভয়ের শেষ নাই, কি যে করবো বুঝে উঠেতে পারছিলাম না । বুঝে গেলাম – আইজকা মাইর খাইতে হইবো । শালা শিবু তো কিছুই জানেনা, বাহাদুরি নিয়া বইসা আছে সামনে । সীতাকুণ্ড পৌঁছানো মাত্র আমরা হটাত সবাই উঠে দাঁড়ালাম নেমে যাওয়ার জন্য । শিবুকেও বললাম নামতে । ও বলল-
: আরে এখনও তো আসি নাই । আমরাতো চিটাগং শহরে যামু ।
: আরে ওঠতো, আমাগো এইখানেই নামতে হইবো ।
এই বলে ওকে টানতে টানতে নামিয়ে ফেল্লাম বাস থেকে । বাস ছেড়ে চলে গেলো । আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম । কিন্তু সীতাকুণ্ড থেকে চিটাগং শহরের বাটালি রোড সেলিমের মামার বাসা পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া করতে যাইয়া মেজাজ খারাপ হইয়া গেলো, ২০ বা ২৫ টাকা ভাড়া চাইলো । ঐ কলার দাম ছিল বেশী হইলে ৫ টাকা । কি আর করা ৫ এর জন্য ২৫ টাকার দণ্ডি দিলাম । ট্যাক্সিতে যেতে যেতে সেলিম বললো যে আমাদের হয়তো মামার বাসায় দুইদিন থাকতে হইতে পারে কারন মামা কিছুতেই রাজী না হইতে পারে একদিন থাকার বিষয়ে। আমরা রাজী হয়ে গেলাম, ভাবলাম চিটাগং শহরটা বেশ ভালো করে দেখে নিবো । কথা হোল যে আমরা মামার বাসায় খেয়ে দেয়ে আজ শুধু রাতে সিনেমা দেখতে বের হবো। আবার কাল সকালে নাস্তা করে সারা শহর ঘুরবো এবং দুপুর নাগাদ ফিরে এসে খাওয়া দাওয়া সেরে আবার বেরিয়ে যাব। এ কয়দিন খাওয়া-দাওয়াটা মামার বাসায় সারবো তাহলে বেশ কিছু টাকা বাঁচবে । রাস্তায় একটা দোকানে থেকে দুই বাক্স মিষ্টি নিলাম মামার বাসার জন্য ।

প্রচণ্ড ক্ষুধার আগুন নিয়ে মামার বাসায় পৌঁছে গেলাম । দরজায় নক করলো সেলিম । কয়েকবার…কিন্তু কেউ খুলছে না দরজা । এবার আমি একটু জোরে জোরে নক করলাম । দরজা খুলে গেলো । একজন মাঝ বয়সী লোক দরজা খুলে দিলো এবং চোখে প্রশ্ন নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
: তোমরা??
: মামা, আমি সেলিম ।
: সেলিম??????!!!!!!!!!!
মামার সেলিম শব্দটা প্রশ্নাকারে শুনে মনে হোলো গত ২৯ বছরে উনি সেলিম নামটি শুনেন নাই, অনেক আগে শুধু একবার এক গল্পে পড়েছিলেন আনারকলি আর সেলিমের কথা । তবে ওনাকে দেখে বোঝা গেলো যে উনি বুঝতে পেরেছেন ঐ আনার কলির সেলিম এটা না।
সেলিম এবার নিজের পরিচয় দেয়া শুরু করলো-
: মামা আমি সেলিম, আপনার কাজিন, ইউসুফ ব্যাপারীর ফুফাতো বোনের জামাইয়ের ছোট শালি হইলো আমার আম্মা । আমার আম্মার নাম শেফালী ।
মামা কিন্তু তখনও ধরায় ফিরে আসেন নাই, উনি শুধু স্ক্যান করছেন ওনার হার্ড ড্রাইভ । ওনার ঐ অবস্থা দেখে আমাদেরও ধরা থেকে বিদায় নেয়ার সময় হয়ে গিয়েছিলো । এভাবে সেলিমের কথায় নেচে ধরাকে সরা জ্ঞান করে মামার বাসায় এসে ধরা খাওয়ার কোন মানেই হয়না । আগেই বোঝা উচিত ছিল যে সেলিমের জীবনটা মোটামুটি ৯৮.৯৯% চাপাবাজিতে ভরপুর । মনে পড়ে গেলো, পকেটে আছে মাত্র ১৮৫ টাকা ।
মামা অনেক্ষন স্ক্যান করার পর বল্লেন-
: ও আচ্ছা! তুমি শেফালির ছেলে? ভিতরে আসো । তা কেমন আছে তোমার আম্মা ।
আমরা হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে পড়লাম ।
: আম্মা ভালো আছেন, আম্মা তো সব সময় আপনার কথা বলেন।
এবার কথা বলে উঠলো শিবু-

: হ্যাঁ মামা, খালাম্মা প্রায়ই আপনার কথা আমাদের কাছে গল্প করেন ।
: তাই নাকি! তো কি গল্প করে ওর আম্মা?
: উনি বলেন যে আপনি নাকি ছোটকালে খুব দুষ্টু ছিলেন, খুব মারতেন খালাম্মাকে ।
মামাকে দেখে মনে হোলো মামা আকাশ থেকে নয় বরং সৌর জগতের বাইরে থেকে এসে পৃথিবীতে পড়লেন উল্কা পিণ্ডের মতো । মামা সেলিমের দিকে তাকিয়ে বললেন-
: তোমার মার দেশ কোথায়?
: বিক্রমপুর
মামা এবার শিবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার জন্ম মুর্শিদাবাদে আর আমার ছোটবেলায় আমি ওর মাকে কোনোদিনই দেখি নাই ।
শিবু ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো। মামা এই বলে ভিতরে গেলেন । সেলিম শিবুকে বলল-
:আজাইরা কথা কস ক্যান? চুপ কইরা বইয়া থাক ।
আমরা ওয়েট করতে থাকলাম পরবর্তী সিনের জন্য । মামা প্রায় ২০ মিনিট পরে একটা বড় প্লেটে করে প্রায় আধা সেরের মতো মিষ্টি বিস্কুট এবং আরেকটা প্লেটে চানাচুর নিয়ে ফিরে আসলেন । প্রচণ্ড ক্ষুধার মধ্যে বিস্কুট আর চানাচুর দেখে মনটা একেবারে দমে গেলো । মামা প্লেট’টা টেবিলে রেখে বললেনঃ তোমরা খাও, আমি চা নিয়ে আসি ।
এই বলে মামা ভিতরে গেলেন । আমরা সবাই রীতিমতো ঝাপিয়ে পড়লাম বিস্কুট আর চানাচুরের উপর । এক সেকেন্ডের মধ্যে বিস্কুট শেষ হয়ে গেলো, শুধু একমুঠো চানাচুর পড়ে রইলো যেটুকু আর হাত দিয়ে উঠানো সম্ভব না । অতো বিস্কুট তো আর মুখে দিয়ে এক সেকেন্ডে খাওয়া সম্ভব নয়, সবাই দুইটা তিনটা করে মুখে দিয়ে গোগ্রাসে খেতে থাকলো আর যে যে কয়টা পারলো, নিয়ে পকেটে ঢুকালো । এই ঘটনাটা ঘটলো ঠিক ৪ সেকেন্ডের মধ্যে অর্থাৎ মামা শুধু পরদা সরিয়ে যেই মুহূর্তে ভিতরে গিয়েছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই লুটতরাজ হয়ে গিয়েছে । বিধিবাম, মামা কি মনে করে যেন আমার ঠিক ঐ ৪ সেকেন্ড পরেই আবার এসে ঘরে ঢুকলেন কিছু একটা নিতে । ফিরে এসেই ওনার চোখ বিস্কুটের প্লেটে আঁটকে গেলো । উনি একবার প্লেটের দিকে তাকালেন এবং পর মুহূর্তেই আমাদের দিকে তাকালেন, আমাদের তখনও মুখভরা বিস্কুট, গালগুলি সবার গোল হয়ে ফুলে আছে । আমরা একেবারে মাটিতে মিশে গেলাম, কি যে লজ্জা লাগলো!!!!! মামা কিছু বল্লেন না, কিছু একটা নিয়ে আবার ভিতরে চলে গেলেন । আমরা সবাই সবার দিকে ভর্ৎসনা নিয়ে তাকালাম, সবাই সবাইকে এমন একটা ভাব দেখালাম যে ‘মানুষ হইলি না’ । মামা আবার চা নিয়ে ফিরলেন । চা টা আমরা খুব ভদ্রতার সাথে খেয়ে আগের অভদ্রতাকে পুশিয়ে দেয়ার চেষ্টা কোরলাম । মামা জিজ্ঞাসা করলেন-
: তা তোমরা কোথায় উঠেছো?
আমার মনে পড়ে গেলো, এক বন্ধু বলেছিল যে কোলকাতার লোকেরা নাকি কোন মেহমান দুপুরে আসলে জিজ্ঞাসা করে “খেয়ে এসেছেন? না যেয়ে খাবেন?” আমাদেরও ঐ একই অবস্থা, ভাবতে থাকলাম “খেয়ে এসেছি? না যেয়ে খাবো?” । সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপ, মামা চেয়ে আছেন একটা পজিটিভ অ্যানসার শোনার জন্য । সবাইকে কিছু না বলতে দেখে আমার একটু সম্মানে লাগলো, আমি বললাম-
:মামা আমরা হোটেলে উঠেছি ।
মামাকে দেখে মনে হোলো মামা খুব শান্তি পেলেন কথাটা শুনে আর আমার বন্ধুদের দেখে মনে হোলো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো ।
মামাঃ ও আচ্ছা । তো সেলিম তোমার আম্মাকে আমার সালাম দিয়ে দিও আর এখানে আসতে বোলো ওনাকে ।

 

মামার বাসায় আর বেশিক্ষণ থাকতে পারি নাই আমারা, বেরিয়ে এসেছি । সেলিমের একটা প্রচণ্ড বদ অভ্যাস ছিল । ওর সামনের দুটো দাঁত নকল বাধানো ছিল, ও যখনি খুব রেগে যেতো অথবা খুশি হতো, ঐ দাঁত দুটোকে জিব দিয়ে একবার মুখের ভিতরে নিতো, আবার বের করে ঐ ফোকলা জায়গায় ফিট করতো, স্থান কাল পাত্র কিছুই খেয়াল করতো না । আমাদের ঐ জিনিসটা খুব ঘিন্না লাগতো, আমরা ওকে থামতে বললেও সহজে থামতো না । মামার বাসা থেকে বেরিয়ে সেলিম ঘন ঘন দাঁত ভিতরে আর বাইরে আনতে শুরু করলো কারন ও বুঝে গিয়েছিলো আমরা ওকে এখন খুব মারবো । সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলাম-
ইশ, মামা, কি আমার মামা!!! মামার কোলে গিয়া উঠলিনা ক্যান?? “মামা আমাগো দুইদিনের আগে বাসা থেইকা যাইতেই দিবনা”, হালায় আমাগো চিনেই না, আবার বাসায় রাখবো । দুপুরবেলা হালার পো চা খাইতে দিসে, হালায় একটা ছোটলোক, ইচ্ছা করসে হালারে ধইরা পু…মারতে, মাইনসের জাত না । আবার শুদ্ধ কইরা জিগায় “কোথায় উঠেছো?”, ওয় তোরে কইতে হইব কোথায় উঠসি??

 

আমাদের রাগ আসলে হয়েছে সেলিমের উপর । সেলিমকে তো আর কিছু বলা যাচ্ছে না তাই মামাকে গালিগালাজ করে সেলিমের উপর ঝাল উঠাচ্ছি। সেলিম অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো । ওকে দেখে মনে হোলো লাজনমাব্রতা বধু, লাজুক লবঙ্গলতিকা, লতিয়ে আছে কলমির ডালে । আমাদের এক বন্ধু সেলিমকে বলল-
ঐ হালা, তুই দাঁত ভিতর বাইর বন্ধ কর, নাইলে দাঁত নিয়ে তোর পু…র মইদ্ধে ঢুকাইয়া দিমু । শালা আমাগো আগেই বোঝা উচিত ছিল যে এই চাপাবাজের কথা কতটুকু বিশ্বাস করুম ।
এতো কষ্টের মধ্যে ওর ঐ ডায়লগ শুনে আমরা হা হা করে হেসে উঠলাম । সেলিমও মিটি মিটি হাসতে থাকলো কিন্তু কিছু বললো না । সেলিম “ফুলেরও জলশায়, নিরব কেন কবি” হইয়া গেসে ।

আমরা একটা খুব চিপ হোটেল ঠিক করলাম, ৩০ টাকা রুম । দুইটা রুম নিলাম তিনজনের জন্য । একটা একটু বড় রুম ছিল, সাথে একটা বাথরুম । সন্ধ্যায় বের হোলাম তবে সিনেমা দেখলাম না কারন পয়সা কমে গিয়েছিলো হোটেল ও খাওয়া সারতে গিয়ে, কক্সেস বাজারও তো যেতে হবে আমাদের । রাতে ফিরে আসার সময় খুজে  এক মদের দোকান থেকে দুই বোতল মদ কিনলাম । মদ খেতে হবে, তা না হলে আবার কিসের পুরুষ! হোটেলে ফিরে ভরপেটে মদ খেতে বসলাম । সেলিমের কি ভাব! ওর কাছে মদ খাওয়া কোন ব্যাপারই না । ঢক ঢক করে নির্জলা মদ মেরে দিলো এক গ্লাস। আমরা তোঁ আশ্চর্য, মদ বিষয়টা আমাদের কাছে নতুন, ভীষণ কিউরিসিটি থেকেই খাওয়ার চেষ্টা । খুবই বাজে টেস্ট, কেন যে খায় মানুষ, ভাবি আমরা । তবুও মনের আসল কথা প্রকাশ না করে বরং বাহাদুরিটা দেখানোই মুল উদ্দেশ্য । ঐ বয়সে মেয়েরা কি পছন্দ করে সেটা একটা বিরাট বিষয় ছিল । ২০ মিনিটের মধ্যে দুইটা বোতল ঢক ঢক করে খেয়ে শেষ করে ফেললাম । মনে হচ্ছিলো – কি হোলো! কিছু তোঁ হচ্ছে না?? টাল তোঁ লাগছে না!!!??? মাতলামি না হলে কি লাভ হোলো পয়সা খরচ করে!! আধা ঘণ্টা পর থেকে অবস্থা খারাপ হওয়া শুরু হলো । ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই আমাদের সবার অবস্থার বারোটা বেজে গেলো, মাথা প্রচণ্ড ঘোরা শুরু হয়ে গেলো, বমি বমি ভাব শুরু হয়ে গেলো । প্রথম বৌনী করলো সেলিম, ভক করে সজোরে বমি বেরিয়ে সোজা গিয়ে দেয়ালে লাগলো । তারপর একে একে আমরা চারজন বমি করা শুরু করে দিলাম যে যেদিকে পারলাম । আমাদের মধ্যে দুইজন বিছানায় পড়ে ঘুমিয়ে গেলো। আমরা সবাই মিলে কোরাস বমি করতে থাকলাম, কারো আর কোন হুশ থাকলো না । বমি করতে করতে কে কখন কোথায় ঘুমিয়ে পড়েছি কারো সেই হুশ নাই । সকালে উঠে দেখি সেলিম বাথরুমের মেঝেতে পড়ে ঘুমাচ্ছে, আমি মেঝেতে পড়ে আছি, বিছানায় তিনজন, আর শিবু দরজার কাছে পড়ে আছে । সারা ঘর বমিতে ভরপুর, প্রচণ্ড মদের গন্ধ । উফফ কি এক অবস্থা!

সবাইকে ডেকে উঠালাম । সবাই উঠলো, রওনা দিতে হবে কক্সেস বাজার । সবাই রেডি হয়ে গেলো । সেলিম ঝামেলা শুরু করে দিলো, ওর নকল দাঁতদুটো আর খুজে পাচ্ছে না। রাতে বমির সময় কোথায় ছিটকে পড়েছে, ও জানেনা । কি যে এক ঝামেলা হোলো, সবাই মিলে ওর দাঁত খোঁজা শুরু করে দিলাম । নাহ, কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না । কি যে মেজাজ খারাপ হোলো তা বলার মতন না। নিজের দাঁত যদি নিজেই সামলাতে না পারে তাহলে কে ওর দাঁত ধরে দাড়িয়ে থাকবে! এজন্যেই মুরুব্বিরা বলে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝতে হয়।

ফোঁকলা সেলিমকে দেখে সত্যি খুব হাসি পাচ্ছিলো কিন্তু হাসা যাবেনা । শিবু বললো-

: ঐ হালা, দাঁতে তালা মাইরা রাখতে পারস না? দাঁত তোর, আর আমরা ধইরা খাড়ায়া থাকুম নাকি!! দাঁতের লেইগা কি দারোয়ান রাখতে হইবো?? এতো কই, দাঁত দিয়া সার্কাস দেখাইস না, কথাতো হুনোস না, অহন দেখ দাঁত গিয়া কই হান্দাইসে?
আরেক বন্ধু খুঁজতে খুঁজতে বিরক্ত হয়ে বললঃ ঐ হালা, এক্সট্রা দাঁত রাখতে পারস না?? একসেট দাঁত থাকলে চলবো?? এহন থিকা দাঁতে চেন লাগায়া রাখবি মাড়ির লগে ।
কি যে অস্থির অবস্থা! সবাই সারা ঘর জুড়ে কোনায় কোনায় দাত খুজে বেড়াচ্ছি । শিবু শেষ পর্যন্ত বাথরুমের কোনায় গিয়ে পেয়ে গেলো দাঁত । যাই হোক দাঁত জায়গা মতো সেট করে আমরা রওনা দিলাম । সব কিছুর সাথে দাঁতটাও আমাদের টেনশন এর মধ্যে যোগ হলো কারন দাঁত হারালে তো আমাদেরই আবার খুজে বের করতে হবে । আমরা সেলিম কে শাসিয়ে দিলাম যে দাঁত দিয়ে আর সার্কাস দেখানো যাবেনা ।

উঠে বসলাম কক্সেস বাজারের বাসে । আমাদের সামনের সিটে একটা মেয়ে তার বাবা মার সাথে বসে আছে। পিছন দিকটা দেখা যাচ্ছে, straight সিল্কি কালো চুল কাঁধের ওপর পড়ে আছে, সুন্দর একটা কামিজ পড়ে, গায়ের রঙটা পোড়া সোনার মতো । আমরা মেয়েটাকে পিছন থেকে দেখেই পাগল হয়ে গেলাম। সবাই শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা শুরু করে দিলাম । আমাদের এক বন্ধু আবার মেয়ে সুন্দর দেখলেই ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করতো শুনিয়ে শুনিয়ে । ও যথারীতি ইংরেজি শুরু করে দিলো । মজার বিষয় হোলো, ফ্লুয়েন্সি দেখানোর জন্য কোন একটা মুখস্থ ইংরেজি গান বেছে নিতো এবং সেটাকেই আউড়াতো । মেয়েগুলিতো ভাবতো – বাহ কি সুন্দর ইংরেজি বলে! যাই হোক, ও হোটেল ক্যালিফোরনিয়া, ব্লাইণ্ড ম্যান ক্রাইস, সোলজার অফ ফরচুন বিভিন্ন গান চালাতে থাকলো । আমরাও শুদ্ধ বাংলার তুফান উঠিয়ে দিলাম, মাঝে মাঝে দুয়েকটা রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়েও কথা বলছি, মাঝে মাঝে শরৎচন্দ্র, বলা যায় না, কোনটা কাজে লাইগা যায়।
আমরা তখনও মেয়েটার চেহারাটা দেখতে পাই নাই । সেলিম আর পারলোনা, উঠে খামোখাই ড্রাইভার এর কাছে গেলো, কি যেন একটা বললো এবং ফিরে আসার সময় মেয়েটাকে বেশ পরখ করে দেখে এসে বসলো ওর সিটে । আমাদের দিকে তাকিয়ে ওর ঢাকাইয়া ভাষায় বললোঃ মাজুল দোস্ত, এক্কেরে মাজুল । ওর কথা শুনে আমরা হতাশ হয়ে আবার আমাদের চলিত ভাষায় ফিরে আসলাম । ইংরেজিও বন্ধ হয়ে গেলো । সবাই বুঝে গেলো মেয়েটার চেহারা একেবারে মাজুল ।

পৌছে গেলাম কক্সেস বাজার । ঠিক বাস স্ট্যান্ডের সাথেই একটা হোটেলে রুম নিলাম । হোটেলে পৌঁছে জামা কাপড় (যদিও তেমন কিছু আমরা নিয়ে যাইনি) চলে গেলাম বীচে । আগে কক্সেসবাজার অনেক ফাঁকা ফাঁকা ছিল, রিকশায় করে হোটেল থেকে বিচে যেতে হতো । ঝাপায়া পড়লাম পানিতে । জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখলাম, কি বিশাল, কি সুন্দর, কি গরজেস, একবারে সিংহের মতো গর্জন কিন্তু কেমন যেন শান্ত। আমাদের এক বন্ধু লম্বায় ৬ ফুট ছিল, প্রচুর অমিতাভ এর ছবি দেখতে দেখতে নিজেকেই অমিতাভ ভাবতো যেমন অনেক লিড গিটারিস্ট স্যাটরেয়ানি শুনতে শুনতে এতই অবসেসড হয়ে যায় যে নিজেকে এক সময় স্যাটরেয়ানি ভাবতে শুরু করে এবং আসে পাশের মিউজিসিয়ানদের ওর কাছে মাজুল মনে হয়, ভুলে যায় যে নিজেরই মাজুলত্তের শেষ নাই । ঐ অমিতাভ মার্কা বন্ধুটা সব সময় চুল আচড়াইতো, সে তা তখন রাত হোক বা দিন হোক, বিপদ হোক বা আনন্দ হোক, দুঃখ হোক বা সুখ হোক, চুল ওকে আঁচড়াইতে হবেই । জীবনে চুল আচড়ানো ছাড়া সব কিছু মিছে । আমরা পানিতে নেমে বুঝতে পারি নাই যে ভাটার সময় । যেই একটু ভিতরে গিয়েছি, পানি আমাদের টান দিয়েছে সমুদ্রের ভিতরের দিকে এবং সবাইকে । পায়ের নিচের মাতি হটাত দেখলাম সরে গেলো, আমরা সবাই ঢেউয়ে ভাসছি যদিও সবাই কাছকাছি । কোনরকমে গায়ের শক্তি দিয়ে সাতরিয়ে একটু ডাঙ্গার দিকে আসার পর যখনি পায়ের নিচে মাটি পেয়েছি, সাথে সাথে উঠে পড়েছি ডাঙ্গায় । তাকিয়ে দেখি অমিতাভ তখনও পানিতে খাবি খাচ্ছে এবং সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় হোলো – মরার আগে শেষ বারের মতো চুলটা আঁচড়ে নিচ্ছে । আমরা হা করে ওর চুল আঁচড়ানো দেখলাম । যদিও অবশেষে প্রানে বেঁচে গিয়েছিলো ।

ইতিমধ্যে দুইদিন পার হয়ে গিয়েছে । পকেটের করুন অবস্থা, শুধু যাওয়ার ভাড়া আর কয়টা টাকা আছে যা দিয়ে কোনরকম কয়েকবেলা খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকা যাবে । কি এক জ্বালা, কি করি এখন! ঐ লম্বু অমিতাভ মার্কা বন্ধুটা ভীষণ বড়লোকের ছেলে ছিলো, দিনে দুই চারশো খরচ করা ওর জন্য কোন ব্যাপার না, মাইয়া দেখলে ২০০ টাকা খাড়ার উপরে খরচ কইরা ফালাইব কিন্তু এই ট্রিপে শালায় গুইনা গুইনা ২৫০ টাকা ৭২ পয়সা নিয়া আইসে । শালায় ইন্দুরের কলিজা নিয়া চলাফেরা করে, মনে হইলো এগো লগে বন্ধুত্তের চাইতে ফকিরের লগে চলাফেরা করা ভালো, অ্যাট লিস্ট ভিক্ষা কইরা খাওয়াইতে পারবো ।

যেদিন চলে আসবো তার আগের দিন আমরা জরুরি বৈঠকে বসলাম সবাই । বিষয় – কিভাবে হোটেলের বিল দিবো?? পকেট গড়ের মাঠ হইয়া গেসে । চেহারা ভয়ে শুকাইয়া চোরের মতো হইয়া গেসে । অমিতাভ কিন্তু চুল আঁচড়াইয়াই যাইতেসে আর সেলিম তো টেনশনে পইড়া দাঁত লইয়া শুধু সার্কাস না, ফুটবলও খেলা শুরু কইরা দিসে । এর মধ্যে শিবু বলল সেলিমকে-
দেখিস, আবার দাঁত খুইলা ফালাইস না, এই টেনশন এর মইদ্ধে আবার দাঁতও খুজতে হইবো ।
সেলিম: ফাইজলামি করিস না, এহন ক কি করবি?
শিবু: কি করুম আবার, মামারে খবর দে, আইসা লইয়া যাউক আমাগো রেস্কিউ কইরা ।
আমি: ঐ অমিতাভ, তোর হাতের ঘড়িটা বেইচা দে, ঢাকা গিয়া আমরা পয়সা দিয়া দিমু ।
অমিতাভ: মাথা খারাপ, আব্বা আমাকে মেরে ফেলবে । (ও আবার শুদ্ধ ছাড়া কথা কইতো না)।
সেলিম: ইসশ, আব্বাওয়ালা, ওনাকে আব্বা মেরে ফেলবে। এইখানে যে হোটেল মালিক আমাগো ধইরা পু…… মারবো, সেইদিকে কোন খেয়াল নাই । আরে হালার’পো তুই আব্বা পর্যন্ত যাইতে পারস নাকি হেইটা দেখ আগে । এখানে টাকা না দিলে তোমার আব্বা পর্যন্ত যাইতে হইবো না, এইখানেই সলিল সমাধি হইয়া যাইবো । সবাই তখন গাইবো ‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা, কে বলে আজ তুমি নাই, তুমি আছো, মন বলে তাই’ ।
অনেক কথা কাটাকাটি তর্কাতর্কির পরে আমরা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম, কথা হোলো, ঐ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা এই বিপদ থেকে মুক্তি পাবো । রাত গভীর হোল, কারো চোখে ঘুম নাই । আর এক মুহূর্তও ভালো লাগছে না এই সমুদ্র সৈকত। বিষের মত লাগছে সবার কাছে সবাইকে। এরকম একটা টেনশনের মধ্যেও সেলিমের দাঁতের সার্কাস অবিরত চলছে, সাথে অমিতাভ এর চুল আঁচড়ানো । ওর নাম কিন্তু অমিতাভ না, কিন্তু আমরা ওকে ঐ নামে ডাকতাম । সবাই অপেক্ষা করছি কখন সকাল হবে । মনে হচ্ছে আর বোধহয় সকাল হবেনা । ক্লান্ত আমরা একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম ।

প্রতিদিনের মতো কক্সেস বাজারে সকাল হোল । আমরা হুড়মুড় করে উঠে বসলাম । মুখ হাত ধুয়ে শিবুর কাছে সবার জামা কাপড়গুলো দিলাম শুধু হাফ প্যান্ট ও টাওয়েল বাদে । শিবু জামাকাপড়গুলো নিয়ে চলে গেলো। তার ঠিক ২০ মিনিট পরে আমরা সবাই হাফ প্যান্ট, স্যাণ্ডো গেঞ্জি পরে কাধে টাওয়েল নিয়ে ম্যানেজারের সামনে দিয়ে হু হু হু হু করে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে আসলাম রাস্তায়, আমাদের এমন ভাব যেনো আমরা গোসল করতে যাচ্ছি বীচে। রাস্তায় বেরিয়ে একেবারে সামনের বাসটা, যেটা ঐ মুহূর্তেই ছেড়ে যাচ্ছিলো চিটাগং এর দিকে, উঠে বসলাম সবাই মিলে। শিবু আগে থেকেই ঐ বাসে উঠে বসেছিলো। কনডাক্টর ড্রাইভার আমাদের বেশভুষা দেখে আশ্চর্য হলো, কিন্তু কিছু বললো না । বাস ছেড়ে দিলো, আমরা শুধু ভাবতে থাকলাম কখন কক্সেস বাজার পার হবে বাসটা। একসময় কক্সেস বাজার ছেড়ে বাস চিটাগং এর দিকে চলতে থাকলো । বুকটা অনেক হাল্কা হয়ে গেলো, আবার ভালো লাগতে থাকলো ।

আমরা ঐ হোটেলের ভাড়া দিতে পারি নাই, আমাদের একমাত্র উপায় ছিল অমিতাভের ঘড়িটা বিক্রি করা। কিন্তু ও রাজী না হওয়ায় আমাদের একমাত্র ভেগে যাওয়ার পথ বেছে নিতে হয়েছিলো । তখন ব্যাপারটা ভীষণ টেনশন এর ছিল । যদিও অন্যায় ছিল ওটা, তারপরও এখন ভাবলে বেশ মজা লাগে। আসলে লাইফে চড়াই উৎরাই না থাকলে, লাইফটা খুবই বোরিং হয় ।

 

 

 

 

আশিকুজ্জামান টুলু, গায়ক, সুরকার ও কম্পোজার, লেখক।

 


নতুন কাগজ | রুদ্র মাহমুদ

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন