আমেরিকা চলে

0
73

জহিরুল চৌধুরী

ডানকিন ডোনাট কফি দোকানের বহুল প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপণ- America run on Dunkin”, এটি একটি চটকদার প্রচারণা। আসলে America run on Rules. এই আইন-কানুন কারা কিভাবে তৈরি করে, কিভাবে প্রয়োগ হয়, আর কেন প্রয়োগ হয়, এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। কিন্তু আইন ছাড়া যে সমাজ চলতে পারে না, সে বিষয়ে এখন আর বিতর্ক নেই সম্ভবত।

বিশ্বের প্রথম লিখিত আইনের কথা আমরা জানি। প্রায় চার হাজার বছর আগে ইরাকে (মেসোপটেমিয়ায়) হাম্মুরাবি’র আইন আসেরিয় সভ্যতাকে কয়েক শ’ বছর স্থায়ী করেছিল। অতঃপর সে আইনই কালের পরিক্রমায় সংশোধন, সংযোজন কিংবা বিয়োজনের মাধ্যমে ইহুদী, খ্রীস্ট কিংবা ইসলাম ধর্মের হাত ঘুরে বিভিন্ন সমাজ পরিক্রম করে।

যুক্তরাষ্ট্রে যে আইন প্রচলিত, সেটির ভিত্তিমূলও বাংলাদেশের মতই রোমান আইন। তবে এই আইন এতটাই যুগোপযোগী, এবং এর প্রয়োগ এতটাই যুক্তিসঙ্গত ও প্রযুক্তি নির্ভর যে আইন অমান্য করে পার পাওয়া এক প্রকার অসম্ভব! সমাজে শান্তি বজায় রাখার জন্য কিছু মানুষকে নিবেদিত হতে হয়। এই নিবেদিত মানুষেরা আর কেউ নয়, যারা আইনের যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগ ঘটায়।

একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করি। আজ সকালে গিয়েছিলাম ব্রঙ্কসের একটি শপিং মলে। সেখানে কয়েক শ’ গাড়ির ভীড়ে একতি গাড়ির চাকা তালামারা (বুটেড) অবস্থায় দেখি। দেখলাম গাড়ির ভেতর একজন শ্মশ্রুমণ্ডিত যুবক বসে আছে। এর নাম ফ্রেড্রিখ।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম- তোমার এই দশা কেন? উত্তরে জানালো- বছর খানেক আগে সে তিন’শ ডলারের একটি টিকেট খেয়েছিল নিউইয়র্কে থাকা কালে। এরমধ্যে সে মুভ করে চলে গেছে পার্শ্ববর্তী নিউজার্সি রাজ্যে। আজ সে এসেছিল নিউইয়র্কে শপিং মলের ডানপাশে উবার অফিসে। পার্কিং লটে গাড়ি রেখে গিয়েছিল উবার অফিসে। ফিরে এসে দেখে তার গাড়ি বুট পরা।

বুটের গায়েই ডিজিটাল লক এবং টেলিফোন নম্বর দেয়া আছে। ফোন করে ক্রেডিট অথবা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে তিন’শ ডলার পরিশোধ করা হলে অফিস থেকে তালা খোলার পিন নম্বর দেয়া হবে, তালা খুলে তালাটি নির্দিস্ট স্থানে জমা দেওয়ার পরই কেবল তার অপরাধের সাজা মওকুফ হবে।

আমার কাছে আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল এটাই যে, এত শত গাড়ির ভেতর নিউ ইয়র্ক সিটি মোটর ভিহাইক্যাল বিভাগ (ডিএমভি)-র লোকজন গাড়িটি চিনল কেমন করে? তারা কি কেবল এই গাড়িটির খোঁজেই এসেছিল?

তাহলে এই আইন মানার বিষয়টি নাগরিক দায়িত্বের কোন পর্যায়ে পড়ে সে কথা বলে এ লেখার ইতি টানছি। মনে করুন গভীর রাতে আপনি একাকি একটি ট্রাফিক লাইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন গাড়ি নিয়ে। এত রাতে আশে পাশে পুলিশ থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তবু আপনি অপেক্ষা করছেন ট্রাফিক লাইটটি সবুজ হওয়ার। তারমানে- অন্ধকারে যে আইন মানে, সে আলোতেও মানতে অভ্যস্থ।

যুক্তরাষ্ট্রে এসে গাড়ি চালানোর প্রথম দিনগুলোতে এন্তার ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালাতে খুবই অসুবিধা হত। নিজেই নিজেকে বলতাম- আইন না মানা দেশের মানুষ আমি। কী করে এত আইন মানব?

একদিন তুষার ঝড়ের মধ্যে আইবিএম থেকে বেড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি ট্রাফিক লাইটের সামনে। আমার গাড়িতে আরো দু’জন বাঙালী ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁদের কারোরই তর সইছিল না। আমাকে প্ররোচিত করছিলেন আমি যেন লাল লাইটের মধ্যেই গাড়ি চালিয়ে চলে যাই, যেহেতু আশে পাশে কোনো গাড়িই নেই! এছাড়া আমার সামনেই একটি গাড়ি ইমার্জেন্সি লাইট জ্বালিয়ে রাস্তা অতিক্রম করে চলে গেল!

সামনের গাড়িটিকে চলে যেতে দেখে আমিও সাহস সঞ্চয় করে লাল লাইটের মধ্যেই চলে গেলাম। পনের-বিশ গজ দূরত্ব যেতেই দেখি- পেছনে বাতি জ্বালিয়ে পুলিশ উপস্থিত। আমাকে টিকেট দিল। আমি যখন বললাম- আমার সামনেই একটি গাড়িকে চলে যেতে আমি দেখেছি। পুলিশ অফিসার জবাবে বলল- যে গাড়িটিকে তুমি চলে যেতে দেখেছ, সেটি ছিল ‘তুষার পরিষ্কারের গাড়ি’, (স্নো প্লাওয়ার)। ইমার্জেন্সি বাতি জ্বালিয়ে তার যাওয়ার অধিকার আছে, তোমার নেই! বলাবাহুল্য- যুক্তরাষ্ট্রে এটিই ছিল আমার প্রথম ট্রাফিক টিকেট। এর আগে অবশ্য একটি খেয়েছিলাম- সেটি বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানোর জন্য।

নিউইয়র্ক, ২৬শে এপ্রিল ২০১৮

 জহিরুল চৌধুরী, সাংবাদিক ও প্রবাসী ব্যবসায়ী।