আবৃত্তি: এক নিবিড় বাকশিল্প

101

দীপক ভৌমিক: ভাষাশিল্পের উপর ভর করে বেড়ে ওঠা এক নিবিড় বাকশিল্প হলো আবৃত্তি। প্রাচীন চিন্তাবিদেরা তাই আবৃত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে বলতেন, ‘আবৃত্তিঃ সর্বশাস্ত্রানাং বোধাদপি গরীয়সী’॥- অর্থাৎ সর্বশাস্ত্রের বোধের চেয়েও আবৃত্তির গৌরব বেশি। আবৃত্তি সম্পর্কে মহাকবি গ্যেটে বলেন, আবৃত্তি বিশেষ ধরনের কথন। এটি একেবারে আপ্লুত হওয়া গদগদকণ্ঠের বক্তৃতা নয়, আবার একেবারে শান্ত; নির্লিপ্ত ভাষণও নয়- এ দুয়ের মাঝামাঝি স্বরের উত্থান-পতনযুক্ত বাচনপ্রথা। কবির আদর্শ এবং কাব্যের বিষয়বস্তুর নানা রসগত পার্থক্য আবৃত্তিকারের মধ্যে যে যে ভাবের সৃষ্টি করে সেই ভাব সে তার কণ্ঠস্বর দিয়ে প্রকাশ করে। এর জন্য তার নিজের স্বভাব অথবা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে বর্জন করতে হয় না।

আবৃত্তিতে কণ্ঠের উপরই বেশি জোর পড়ে। তাই কণ্ঠস্বরে কবিতার ভাব ও অনুভূতি প্রকাশ করাই আবৃত্তির মূলকথা। উচ্ছ্বাসপূর্ণ বক্তৃতা আর আবৃত্তি এক কথা নয়। আবৃত্তি অভিনয় ও পাঠের মাঝামাঝি। তবু এতে স্বরভঙ্গি বা modulation থাকে। তবে তা অভিনয়ের মতো অতটা নয়। জীবনের নানা রূঢ়তায় কবিতা আবৃত্তি আমাদের পরিশোধিত করে, উদ্দীপিত ও অনুপ্রাণিত করে। দ্বন্দ্বময় জীবনের কর্মক্লেদে আবৃত্তি এনে দিতে পারে প্রশান্তি। স্বর্গের অমৃত আনন্দ আবৃত্তির মাধ্যমে উপভোগ করা যায়। যা অনভ্যাসে হওয়া সম্ভব নয়।

আবৃত্তি প্রসঙ্গে I. M. W. Hunter বলেছেন, It is a habit of the vocal machinery learned through repeated trials (rehearsals), according to the laws of their habit formation – অর্থাৎ আবৃত্তি হচ্ছে অধিগত বিদ্যা। ধারাবাহিক ও নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনের মধ্য দিয়েই এ ব্যাপারে অধিকার অর্জন করতে হয়।

আবৃত্তি প্রাচীনকাল থেকেই আজ অবধি সর্বপ্রধান ও সর্বপ্রথম বাচিক শিল্প। এরপরেও আমাদের দেশে প্রাচীন পণ্ডিতেরা আবৃত্তিকর্মে নানান ত্রুটি বিচ্যুতির বিষয়ে অবহিত ছিলেন। ধ্বনিবিজ্ঞান, উচ্চারণরীতি সম্পর্কে বিস্তৃত অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তারা এ সম্পর্কে যাবতীয় নির্দেশনাও লিপিবদ্ধ করেছিলেন এভাবে-

যদক্ষরং পরিভ্রষ্টং। মাত্রাহীন যদ্ভবেৎ॥

যন্মাত্রাবিন্দু। বিন্দু দ্বিতয়॥

পদপদদ্বন্দ্ব। ছন্দগতি বর্ণাদি হীনঃ॥

প্রবচনবচনাৎ। ব্যক্তমব্যক্তম॥

মোহাদপঠিতম্। অজ্ঞানতাপঠিতম্॥

অর্থাৎ অক্ষরভ্রষ্টতা, ভুলমাত্রায় উচ্চারণ, বিসর্গের অনুচ্চারণ অথবা ভুলভাবে বিসর্গস্থাপনা, সমাস-ছন্দ-যতি বর্ণ বিলোপসাধন অথবা ত্রুটিযুক্ত সংস্থাপন, স্মৃতির অনধিকার প্রবেশের কারণে পূর্বপরিচিত শব্দের ভাবনিরপেক্ষ উচ্চারণ, অস্পষ্ট, অর্ধস্পষ্ট কিংবা অনুচ্চারিত অক্ষর, অনর্থক উচ্চারণ; প্রাণ বা শ্বাসবায়ু সংযমের ব্যর্থতা থেকে মহাপ্রাণ বর্ণ অল্পপ্রাণ হয়ে যাওয়া কিংবা অল্পপ্রাণ বর্ণ মহাপ্রাণ বর্ণে রূপান্তরিত হওয়া (দুধ=দুদ্, গর্দভ=গর্দব, আম=আঁব, লেবু=নেবু) এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সতর্কবাণী প্রয়োগশিল্প হিসেবে আবৃত্তির নির্দিষ্টস্বরূপ রচনা করেছে। এছাড়া কবিতার বিষয়বস্তুকে সম্যকভাবে উপলব্ধি না করায় স্বরের প্রকাশে ও স্বরপরিবর্তনে শ্রোতামণ্ডলীর কাছে বিকৃত রস ও অর্থব্যঞ্জনার পরিবেশন গর্হিত কাজরূপে কথিত হয়েছে।

আবৃত্তি আর অভিনয়কে রবীন্দ্রনাথ কতখানি আলাদা ভাবতেন তা তার উক্তি দিয়েই বোঝা যায়। ‘আবৃত্তি আর অভিনয় দুটো স্বতন্ত্র শিল্প- কিন্তু দেখেছি, অনেকেই দুটোকে অভিন্ন মনে করেন। তাই গলা কাঁপিয়ে এবং হাত পা নেড়ে আস্ফালন করাকে তারা চালিয়ে দেন আবৃত্তি বলে। আবৃত্তি বাচন শিল্প- অভিনয় আনুষ্ঠানিক শিল্প, আকারে সমধর্মীতা থাকলেও তাই প্রকাণ্ড প্রকারভেদ রয়েছে দুটোর মধ্যে।’ (কাছের মানুষ রবীন্দ্রনাথঃ নন্দলাল সেনগুপ্ত)

আবৃত্তিচর্চার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কথার গুরুত্ব অনেকটাই অনিবার্য। যদিও কোন শিল্প প্রয়োগ অথবা নির্মাণের ব্যাপারে শেষ কথা বলতে পারে না। আবৃত্তি শিল্পের বিষয়ে একথা সত্য। আবৃত্তির কোনো স্বরলিপি নেই। কিন্তু শিল্প বলে তার বিবর্তন রয়েছে। আমাদের দেশে মধ্যযুগে আবৃত্তি করবার রীতি অন্যরকম ছিল। গানের মতো সুর করে কবিতা বা পাঁচালি পড়া হতো। কখনও কখনও এসব সুর করে পড়ার মধ্যে রাগ-রাগিনী এসে পড়ত। হিন্দি বা ওড়িয়া ভাষায় এখনও গানের ঢঙে আবৃত্তির রেওয়াজ রয়েছে।

অতি পুরনো কাল থেকে সবদেশেই আবৃত্তিচর্চা চলে আসছে। আমরা জানতে পারি ইতিহাস থেকে প্রাচীন গ্রীকদের আবৃত্তিপ্রীতির পরিচয়। সোফোকিস নাট্যকার হবার আগে আবৃত্তি করতেন কোরাসের দলে। শ্রেষ্ঠ গ্রীক বক্তা ডেমোস্থিনিস তার জিভের জড়তা কাটানোর জন্য সব সময় ছোট পাথরের টুকরো মুখে দিয়ে রাখতেন এবং স্পষ্ট উচ্চারণ ও গলা ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত কণ্ঠসাধনা করতেন। কণ্ঠ ও উচ্চারণ দিয়েই তিনি ফিলিপ অফ মেসিডোনকে বক্তৃতার মঞ্চে হারিয়ে দিয়েছিলেন। বিখ্যাত রোমান বক্তা সিসেরো জুলিয়াস সিজারের মারা যাবার পর এন্টনি বিরোধী বক্তৃতার মাধ্যমে দুনিয়াকে বিস্মিত করেছিলেন।

কোনো শব্দ উচ্চারণে সময় জিভের ক্রিয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবহাররীতি অথবা কণ্ঠস্বরের ও বানান কী পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত হবে, সে সম্পর্কে নির্দেশ দেয়া ছাড়াও অনেক সূক্ষ্ম বিষয়ে তিনি আলোকপাত করেছিলেন। প্রতিটি অক্ষর এবং শব্দে কিভাবে প্রাণের ছোঁয়া দিতে হবে, যান্ত্রিকতাপুষ্ট না হয়ে লম্বা বাক্য পড়বার সময় কখন কোথায় দম নিতে হবে- এসব নির্দেশও সিসেরো দিয়ে গেছেন ‘দি অরেটর’ নামক বইয়ে দুহাজার বছর আগে।

প্রাচীনকালে দেশে বিদেশে আবৃত্তি শ্রুতিনির্ভর পাঠনবিদ্যা ছিলো। আবৃত্তি কথাটি অবশ্যই কোনো সাম্প্রতিককালে সৃষ্ট প্রয়োগবিজ্ঞান নয়, অন্তত দুহাজার বছরের আগে থেকে যে এর চল ছিল তার প্রমাণ শ্রুতি বা বেদ। প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো ঋগবেদের এবং পরবর্তীকালে সাম-যজু-অথর্ববেদের শ্লোকসহ আবৃত্তি করা হতো। এই বিদ্যাও ছিল গুরুমুখী অর্থাৎ গুরু শিষ্য পরম্পরায় বাহিত হতো মুখে মুখে। প্রাচীন চীনে লাউৎসে ও তার শিষ্য কনফুসিয়াসের দর্শনশাস্ত্র শ্রুতি পরম্পরায় রক্ষিত হয়েছ বিশেষ এক ধরনের আবৃত্তি প্রক্রিয়ার ও পরবর্তীসময়ে পাহাড়ের গায়ে তক্ষণ প্রক্রিয়ার সুপ্রয়োগে। মিশর ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতার কাব্যসাহিত্যও আবৃত্তি করা হতো কিংবা গীত হতো বলে জানা গেছে। আমাদের দেশে বৈদিক যুগ পরবর্তী বৌদ্ধশাস্ত্রসমূহ বিশেষ সুর-তাল-লয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি করার কথা পণ্ডিতরা উল্লেখ করেছেন। লেখার পদ্ধতি জানা থাকা সত্ত্বেও দুহাজার বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত ঋগবেদের শ্লোকগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়নি প্রধানত একটি কারণে- লেখাপড়ার চেয়েও আবৃত্তির উত্কর্ষতা।

ড. সুকুমার সেন বলেন, বৈদিক সাহিত্য যখন রচিত হয়, তখন লেখবার পদ্ধতি আমাদের জানা ছিল না। বৈদিক ঋষিরা রচনা করতেন মুখে এবং সে রচনা কাগজে লিখে রাখার মতোই ধরে রাখতেন মুখে মুখে, আবৃত্তির সাহায্যে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের যে কাজ এখন লেখার ও ছাপার দ্বারা সাধিত হচ্ছে, তা একসময় আবৃত্তির দ্বারা সাধিত হত।

এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আবৃত্তির উত্কর্ষতাকেই চিহ্নিত করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, লেখাতে ভাষার সবটুকু ধরা পড়ে না। না কণ্ঠস্বর, না সুরের টান, না ঝোঁক। কিন্তু আবৃত্তিতে এসবই যথাযথ বজায় থাকে। প্রধানত এ কারণেই প্রায় দু’হাজার বছর পর্যন্ত বেদের কবিতা কাগজে কলমে বিধৃত হয়নি। কণ্ঠে কণ্ঠে প্রবাহিত হয়ে এসেছে।

আবৃত্তিকে সর্বশাস্ত্রে বোধের চেয়ে গৌরবের মনে করা হতো আরও একটি কারণে। আবৃত্তি প্রথম পর্যায়ে স্মৃতি সহায়ক, দ্বিতীয় পর্যায়ে বোধ উৎপাদক। কিন্তু আবৃত্তির এটি যেন নেপথ্য ভূমিকা। এজন্যই একক বোধলাভের চেয়েও আবৃত্তি শিক্ষার অনেক বেশি গৌরব ধার্য করেছিলেন প্রাচীন ঋষিরা। তাই তারা আবৃত্তি বলতে ‘পুনঃপুনরর্থানুসন্ধানং আবৃত্তি’ বলেছেন। অর্থাৎ বারবার উচ্চারণ করে কোনো শব্দের গুঢ় অর্থ অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াই হল আবৃত্তি।

আর্য সমাজে এমনকি বৌদ্ধ যুগেও সমাজজীবনে আবৃত্তির ছিল দোর্দ- প্রতাপ। বৈতালিক, বন্দী, ভাট, নকীব আবৃত্তি করেই রাজসভার সূচনা করতেন। মঙ্গলাচরণ স্বস্তিবাচন, ভরতবচন, প্রণতি, আশীর্বচন সবই হত আবৃত্তির মাধ্যমে। সেসময় আবৃত্তি করে জীবিকা অর্জন করতেন সভাকবি।

আধুনিককালে বাংলাভাষায় আবৃত্তির নবতর প্রসার ঘটে বিশ শতকের প্রথমদিকে। মূলত রবীন্দ্র কবিতার আবৃত্তি দিয়েই আধুনিক আবৃত্তির শুভ সূচনা। শিশিরকুমার ভাদুড়ি আধুনিক আবৃত্তির প্রথম পথিকৃৎ। বাংলা, ইংরেজি কবিতার আবৃত্তি তার মুখে সবসময় ঘুরত। সংস্কৃত আবৃত্তিতে সেরা ছিলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। শিশিরকুমার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবিশেখর কালিদাস রায় লিখেছিলেন-

যখন তখন তার গলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা উদগীরিত হত স্বতস্ফূর্তভাবে। ইনস্টিটিউট হলে ঢুকত সে আবৃত্তি করতে করতে- তার জীবনটাই একখানি রসাঢ্য কাব্য।

শ্রীশঙ্কর ভট্টাচার্য: নাট্যাচার্য শিশির কুমার (১ম সং), পৃষ্ঠা-১০

প্রাচীনকালে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে আবৃত্তি বলতে যা বোঝাত তা হলো পাঁচালি, পুঁথি, রূপকথা, আশীর্বচন ইত্যাদি সুরেলা পাঠ। আবৃত্তির মোড় ঘুরে যায় আধুনিক বাংলা কবিতার উন্মেষপর্বে।

আধুনিক বাংলা কবিতার আবৃত্তির আগে পর্যন্ত আবৃত্তি ছিল সর্বজনীন পার্বনিক বিষয়। আধুনিক কবিতার আবৃত্তি সাধারণ ও বোদ্ধাদের মধ্যে মোটা রেখা টেনে দিয়েছে। আবৃত্তি ক্রমশ রূপ নিয়েছে বিশেষ শ্রেণীর চিত্তরঞ্জক শিল্পে। পালা গান, ঘেঁটু গান, মঙ্গলাচরণ, কবিগান, পালাকীর্তন ইত্যাদি বাঙালির ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তিও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কারণ ওইসব গণমুখী পরিবেশনায় আবৃত্তি আর গান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলত। তবে এ পরিস্থিতিতে সচেতনভাবে আবৃত্তিকে জনধারায় ফিরিয়ে আনতে বিপরীত সচেষ্টতাও বহমান আবৃত্তিকর্মী ও সংগঠকদের মাঝে। আবৃত্তি আর গানের সহাবস্থান কালের ধারায় ছিন্ন হবার পর আবৃত্তি আজ ঠাঁই নিয়েছে নাগরিক জীবনের বাধা আঙিনায়।

তবে দৈনন্দিন জীবনে আবৃত্তির ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন ঠাকুমা-দিদিমা, দাদী-নানীরা। ছোটদের ঘুমপাড়াতে এখনও নানা আবৃত্তি করেন তারা। আশার কথা, আবৃত্তিকে পূর্ণাঙ্গ জীবিকা হিসেবে নেয়ার যথেষ্ট সময় এখনও না এলেও তারা আসবার নানা আভাস তৈরি হচ্ছে। একটি স্পষ্ট ও পৃথক শিল্প হিসেবে আবৃত্তি আজ বাঙালি সংস্কৃতিতে নিজে প্রতিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াবার উপক্রম করছে, গতিপথ রচনা করছে।

আবৃত্তির ব্যুত্পত্তিগত ধারণা

আবৃত্তি শব্দটির ব্যুত্পত্তিগত অর্থ- বারংবার পাঠ। আবৃত্তি একটি প্রাচীন শব্দ। পৌরাণিক কাল থেকে এই নামের ব্যবহার হয়ে আসছে। বাংলাভাষায় যে বিশটি উপসর্গ পাওয়া যায় তার একটি হলো আ। আবৃত্তির আ হলো পূর্বক বৃৎ ধাতু ক্তি প্রত্যয়। আ এর অনেক অর্থ। এককথায় এর অর্থ সম্যক বা সর্বতোভাবে। বৃৎ ধাতুর অর্থ হওয়া বা পড়া। আবৃত্তির প্রাচীন অর্থটা হয় এরকম- সম্যকরূপে বা সর্বতোভাবে। যা পঠিত বা উচ্চারিত। আবৃত্তির আভিধানিক অর্থ স্মৃতিনির্ভর পাঠ। পূর্বে শোনা, দেখা বা পড়া কোনো ঘটনা বা বিষয়কে মনস্থ করে অপর কোন ব্যক্তির কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং সৌন্দর্যমণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হলে তাকে আবৃত্তি বলা হয়। আবৃত্তি একক, দ্বৈত এবং সম্মিলিত- তিন রীতিতে পরিবেশিত হয়ে থাকে। একক রীতিতে একজন আবৃত্তিকার একটি বা একাধিক কবিতা অথবা কয়েকজন আবৃত্তিকার একটি করে কবিতা বলে থাকেন। সম্মিলিত রীতিতে বহুজন মিলিতভাবে কখনো একক, কখনো দ্বৈত, কখনোবা কোরাস কণ্ঠে আবৃত্তি পরিবেশন করে। আর্য যুগে যে চৌষট্টি কলার চর্চা করতে হত তার ভেতরে দুটি কলার নাম যথাক্রমে ‘সংপাঠ্য’ ও ‘মানসী কাব্যক্রিয়া’। সংপাঠ্য বলতে বোঝায় বিষয়কে সম্যকভাবে পাঠ করা। নিশ্চয়ই তা পাঠ করা হত শ্রোতার সামনে তাকে জানাবার জন্য বা তার চিত্তে রসোপলব্ধি সৃষ্টির জন্য। কামসূত্রের টীকাকার যশোধর বলেছেন যে সংপাঠ্যে সাধারণভাবে পড়বেন একজন আর একজন তার সহযোগিতা করবেন। প্রসঙ্গটি যৌথপাঠ বা আবৃত্তিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

মানসী কাব্যক্রিয়ার মধ্যেও আবৃত্তির ধর্ম বর্তমান। সংস্কৃতে এর টীকায় বলা হয়েছে যে মাত্রা, পংক্তি, সংযোগ, অসংযোগ, ছন্দ, বিন্যাস ইত্যাদি ঠিকভাবে অনুসরণ করে সর্বসমক্ষে পাঠ করাকেই মানসী কাব্যক্রিয়া বলে। একে আবৃত্তির নামান্তর হিসেবেই গণ্য করা যায়।

সৃষ্টি ও জীবনবোধের সঞ্চালক আবৃত্তিকার

আবৃত্তির ইতিহাসে বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লেখা মধুসূদনের চিঠির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। স্পষ্টবক্তা মধুসূদন প্রকৃতই বলেছিলেন, আবৃত্তির রসাস্বাদন করতে গেলে আবৃত্তিকার ও শ্রোতা দুপক্ষকেই প্রস্তুত হতে হবে। তার প্রথম পথ Read Read and Read – পড় পড় আর পড়। দ্বিতীয় পথ Teach your ears the new tune – কানকে এই নতুন সুর শিক্ষা দাও। মধুসূদনকে নিজে আবৃত্তি শুনিয়ে শ্রোতা ও পাঠককে প্রস্তুত করতে হয়েছে-কান তৈরি করতে হয়েছে।

আবৃত্তিকার শব্দকে সঞ্জীবিত করেন, ভাব ও অর্থকে সঞ্চারিত করেন। নিছক পাঠ বা উচ্চারণকে প্রশ্রয় দিয়ে নয়; আবৃত্তি যতটা প্রয়োগধর্মী, ততটা সৃজনধর্মী শিল্পও। বিষয়ের মর্ম উপলব্ধি করে বোধ, বুদ্ধি, অনুভূতি দিয়ে মননে অনুশীলনে আবৃত্তিকার বহু ব্যঞ্জনার রসে শ্রোতাকে শুধু আকৃষ্ট বা আবিষ্ট করেন না, উদ্ধুদ্ধ আর অনুপ্রাণিত করেন। কবির কবিতাকে নিয়ে রূপে রঙে রসে প্রাণবন্ত কবিতার মতো মনোহর প্রাসাদ গড়ে তোলেন আবৃত্তিকার। আবৃত্তিকারকে অনেক বেশি সংবেদনশীল গ্রহণশীল হতে হয়। মনের সব দরজা জানালা খোলা রেখেও তার দরকার ঘরের বাইরে আরও আলো আরও আকাশ।

যখন কবিতা রচনা হয় তা সাহিত্য। আর যখন সেটি আবৃত্তি করা হয়, তা হয়ে দাঁড়ায় স্বতন্ত্র শিল্প। শিল্প হয়ে সে আর একবার সম্পূর্ণ হয় অন্যভাবে। তবে একে আমরা আবৃত্তির নির্মাণ বলে অভিহিত করতে পারি। নির্মাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকতে পারে, তবে আবৃত্তির প্রকাশরীতি কেমন হবে তা আবৃত্তিকার নিজস্ব মনন ও মেধা দিয়েই নির্বাচন করবেন। তথাকথিত ছন্দোবদ্ধ এবং সহজবোধ্য কবিতাই তিনি মনোনীত করবেন তেমন মেনে নেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কঠিন গদ্যছন্দের কবিতাও তার আবেদনগ্রাহ্য থাকতে পারে। কবিতা নির্বাচনে ষোল আনা স্বাধীনতা রয়েছে আবৃত্তিকারের। তবে নিজের জন্য কবিতা পড়া আর শ্রোতাকে শোনানোর জন্য কবিতা আবৃত্তি করা এ দুটোর মধ্যে অসীম ব্যবধান স্পষ্টত আলাদা ব্যাপার। কাজেই আবৃত্তি সার্থক শিল্পরূপে পরিবেশিত না হলে তার আবেদন শ্রোতা-ইন্দ্রিয়কে কখনোই স্পর্শ করে না।

আবৃত্তিকারকে পরিচিত হয়ে নিতে হয় কবিতার অন্তরাত্মার সঙ্গে। কবিতার ভেতরের ব্যাপারটি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে হয় অন্তরে, বাইরে প্রকাশের সময় সেই ব্যঞ্জনাকে বাজাতে হবে সঠিক সুরে। উচ্চারণ বিকৃতির ভার আবৃত্তি সইতে পারে না। নিয়ত অনুশীলনের মাধ্যমে আবৃত্তিকারকে আয়ত্ত করতে হয় নির্ভুল উচ্চারণ।

সেই পুরনোকাল থেকেই অভিনয়ক্রিয়ার সঙ্গে আবৃত্তিকলা সম্পৃক্ত থাকলেও কিছুটা স্বাতন্ত্র্য অবশ্যই ছিল। আবৃত্তির কৌশল অভিনয় থেকে আলাদা, আবৃত্তিকারকে কাব্যের সব দিক পরিপূর্ণ উপলব্ধি করতে হয়। কারণ কাব্যে যতগুলো রস প্রতিভাত হয়, তার সবগুলোই আবৃত্তিকারকে একক প্রচেষ্টায় কণ্ঠসম্পদের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে এবং তার দ্বারা কবিতার সামগ্রিক প্রভাব শ্রোতাদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে হবে। একজন অভিনেতার কাজ শুধু সংলাপকে ব্যক্ত করা। কিন্তু আবৃত্তিতে এর বেশি কিছু যুক্ত হয় যা কবিতার ক্রিয়াকর্মকে মূর্ত করে তোলে। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে আবৃত্তি ও আবৃত্তিশিল্পীকে ঘিরে কবিদের সংশয় দূর হয়েছে। আবৃত্তি নানা বাঁক নিয়ে এখন স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে নিজ পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, কবি কী ভেবে কবিতা লিখেছেন, আবৃত্তিকারের তা জানবার প্রয়োজন নেই। কবিতাকে ঘিরে তার নিজস্ব চিন্তা থেকেই আবৃত্তি করা উচিত। সমালোচকরা বলেন, আবৃত্তিকারের সাহিত্যবোধ অভিনেতার চেয়ে বেশি সক্রিয় ও গভীর হওয়া প্রয়োজন। আবৃত্তি মূলত Subjective বা মনোকেন্দ্রিক, আমাদের চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রিত, আর অভিনয় মূলত Objective বা বাস্তবকেন্দ্রিক। যা প্রয়োগের মাধ্যমে স্পষ্ট। সুতরাং আবৃত্তিকারকে কিছু পরিমাণে অন্তত বুদ্ধিজীবী হতে হয়। কারণ তাকে কবি অনুসারী হয়েও একজন স্বতন্ত্র স্রষ্টা হতে হয়।

শেষকথা

ভালো আবৃত্তির জন্য যে গুণটির সবচে বেশি প্রয়োজন তা হল কাব্যবোধ-কবিতাকে ভালোবেসে যার উন্মেষ। কবিতাকে ভালোবেসে আবৃত্তিকার কবির রথের সারথি হয়ে কবিতার রূপ রস-গুণ দর্শকের কাছে পৌঁছে দেবেন আবৃত্তি এমন প্রত্যাশা রাখে। কালে কালে বহুজনের আন্তরিক সাধনা ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আবৃত্তি আজ শিল্পশাখা হিসেবে পল্লবিত হয়ে উঠেছে। আবৃত্তি জনপ্রিয়তার সীমানা স্পর্শ করছে, আবৃত্তির অনেক অনুষ্ঠান বাণিজ্যিক সাফল্যও অর্জন করছে। একজন আবৃত্তিকার যখন বহুস্তর বিন্যস্ত কবিতাকে অনুভব করে সেটি পৌঁছে দেন শ্রোতার কাছে তখন তাকে শিল্পী হিসেবে মেনে নিতেই হয়। আবৃত্তি নীরব একক উপলব্ধির সঞ্চার, একটি কবিতার পুনর্জন্ম। যা একজন আন্তরিক ও বিশিষ্ট শ্রোতামাত্রেই বুঝতে পারেন। স্বনির্ভর শিল্প হিসেবে আবৃত্তির পাশাপাশি আবৃত্তিকারও এমন একজন শিল্পী যার সম্বল শুধু নিজস্ব কণ্ঠ, কাব্যরুচি ও কবিতার খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে যথাযথ সচেতনতা, যার কোনো একটির অভাবই তার শিল্পী হবার পক্ষে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে।

বাস্তবতা হলো, আবৃত্তিশিল্পের প্রচুর সম্ভাবনা ডালপালা ছড়িয়েছে। নতুন নতুন সম্ভাবনার দিগন্তগুলো আবিষ্কার করেই আবৃত্তিশিল্প বাঁচবে। তবে নাগরিক জীবনের বাধা আঙিনায় কেন্দ্রীভূত না রেখে আবৃত্তিকে জনমানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাবার চেষ্টাও অব্যাহত রাখা জরুরি। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে আবৃত্তির মাধ্যমটি নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। একক আবৃত্তির প্রচলিত ধারা অতিক্রম করে দলবদ্ধ চর্চার পরিধি ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে। দল বেঁধে কাজ করতে গিয়ে দৃঢ় হয়েছে পারস্পরিক সম্পর্কের বাঁধন। এতে করে একক চিন্তার পরিবর্তে সমন্বিত চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে আবৃত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে।

আবৃত্তি আজ প্রয়োগশিল্পের মর্যাদার দাবি রাখে। অন্যান্য প্রকাশধর্মী প্রয়োগশিল্পের পাশাপাশি আবৃত্তির আসনও এখন স্বমর্যাদায় স্থির। তাই এখন অনেক আবৃত্তিকার, অনেক সংগঠন, অনেক সংস্থা তার মশাল বয়ে চলেছেন। আবৃত্তি আজ আমাদের দেশে নাটক ও সঙ্গীতের মতো গুরুত্ব বহন করে। আবৃত্তি অনুষ্ঠানে লোক সমাগম এই ধারণাকে আরও সমর্থন করে। আশির দশক থেকে বাংলাদেশে আবৃত্তি শিল্পে নব-আন্দোলন ও জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। নানা চড়াই- উৎরাই থাকলেও আবৃত্তিকর্মী ও সংগঠকদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করে সঠিক পরিকল্পনা তৈরির মাধ্যমে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে সবখানে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে যোগ রেখে আবৃত্তিকে যথাযথ প্রয়োগ করে দেশের মানুষকে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে, প্রেম, মানবতা, ভাষা ও দেশ দিয়ে ভাবতে শেখাবে আবৃত্তিকর্মীরা, নিঃসন্দেহে এই আশা করা যায়।

আবৃত্তি শিল্পের উপাদানকে ধারণ করে অন্যান্য শিল্পমাধ্যমগুলো দাঁড়িয়ে আছে। পারফর্মিং আর্টের অনেক শাখা রয়েছে যেখানে আবৃত্তির সহযোগিতা অনস্বীকার্য। তাই আজ যখন অন্যান্য অনেক শিল্পমাধ্যম জীবনবিচ্ছিন্ন, বোধবিচ্ছিন্ন, তখন আবৃত্তির দায় আরও বেড়ে গেছে। আবৃত্তিকার তার সজীব কণ্ঠ দিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ উচ্চারণ ও আবৃত্তির মাধ্যমে মানুষকে আশা জাগাতে পারেন, জীবন ও আলোর পথ দেখাতে পারেন। এ জন্য আবৃত্তিশিল্পীকে এই বাকশিল্পের নিবিড় শীলন করা জরুরি। আর আবৃত্তিও সফল হয়ে উঠবে আবৃত্তিকারের বোধ, উপলব্ধি ও প্রকাশের ব্যঞ্জনার নিত্য প্রসারণে।