Natun Kagoj

ঢাকা, বুধবার, ২২শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং | ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ৩রা রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

আইসিডিডিআরবি’র অতীত ও বর্তমান

আপডেট: ০৪ জুলা ২০১৭ | ১২:০৭

ফিরোজ আহমেদ: আইসিডিডিআরবি (International Centre for Diarrhoeal Disease Research, Bangladesh; icddr,b) এর জন্মাতিহাস একটু জানা দরকার। যার গোড়াপত্তনের মূলে ছিল ষাটের দশকে দেশি-বিদেশী একঝাঁক তরুন বিজ্ঞানীর উদ্যোগে চাঁদপুরের মতলব উপজেলায় সেসময়ে গড়ে ওঠা সিয়াটো কলেরা রিচার্স ল্যাবরেটরী (SEATO Cholera Research Laboratory)।

পরবর্তী সময়ে এই দেশি-বিদেশী বিজ্ঞানী প্রজন্ম, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়ে মহাখালীতে গড়ে ওঠা স্থাপনায় গোপনে ঢাকার গেরিলাদের চিকিৎসা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ের সিয়াটো কলেরা রিচার্স ল্যাবরেটরীতে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া পাকিস্তানী সেনাদের ঢোকার অনুমতি ছিল না।

দেশ স্বাধীনের পরে এঁদের হাতে দিয়েই আবিষ্কৃত হয় যুগান্তকারী ওরস্যালাইন (Oral Cholera Saline)। এঁরাই পরবর্তীতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারকে বুঝাতে সমর্থ হন যে, সিয়াটো কলেরা রিচার্স ল্যাবরেটরীকে আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রে রুপান্তরের মাধ্যমে চিকিৎসা গবেষণায় প্রাচ্য-পাশ্চ্যাতের সেতুবন্ধন তৈরি করা সম্ভব।

সে সময়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সফল বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে আইসিডিডিআরবি অধ্যাদেশ (ICDDR,B Ordinance-1978) জারি করে প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিকীকরণ করা হয়। তখন থেকেই শুরু হয় দেশী-বিদেশী বেতন বৈষম্যসহ ক্ষমতা দখলের রাজনীতি।

আশির দশকের শেষভাগে, একটি মহল একপর্যায়ে যাদের মাধ্যমে আইসিডিডিআরবি’র সৃষ্টি ও সুনাম এসেছে, তাদেরকেই প্রতিষ্ঠান ছাড়তে বাধ্য করে। এক কথায়, আইসিডিডিআরবির আন্তর্জাতিকীকরণ এর মাধমে অধ্যাদেশ (ICDDR,B Ordinance-1978) এর বাধ্যবাধকতায় বোর্ড অব ট্রাস্টিস (Board of Trustees) এর হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষমতা চলে যায়। আগেই বলেছি, বোর্ড অব ট্রাস্টিস-এ বিদেশীদের সংখ্যাধিক্যের (১৪/৩) কারনে বাংলাদেশী প্রতিনিধিরা শুরু থেকেই কোনঠাসা হয়ে পড়ে।

ফলে, গবেষণার ক্ষেত্র ও কর্মপন্থা নির্ধারণে বিদেশীদের মতামতের প্রাধান্য বাড়তে থাকে। দেশী সদস্যদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস একাজে বিশেষভাবে সহায়তা দেয়। এমনও হয়েছে যে, বাংলাদেশ সরকারের তিন প্রতিনিধির মধ্যে দুই মন্ত্রণালয়ের দুজন সচিবের একজনও বোর্ড অব ট্রাস্টিস এর সভায় আসেন নি, আর একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক ১৪ জন বিদেশীর সাথে যুদ্ধ করে ব্যর্থ মনোরথে ফেরত যাচ্ছেন।

অন্যদিকে, আইসিডিডিআরবি’র টাকায় বোর্ড সদস্য ও তাদের পরিবারবর্গের বিদেশ ভ্রমণসহ অন্যান্য সুবিধাদি নেবার নজিরও আছে। এসবের সাথে যোগ হয়েছে কর্মরত বিজ্ঞানীদের মাঝে আন্তর্জাতিক স্তরের বেতনের লালসা, ক্ষমতার শীর্ষে গিয়ে গবেষণায় বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগ দখল, বিদেশী দাতাতের কাছাকাছি যাবার অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও বিদেশীদের স্বার্থসিদ্ধিতে সহায়তা করতে মুষ্টিমেয় সোচ্চার বিজ্ঞানিদেরকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করার চক্রান্ত। বিদেশী চাহিদামত গবেষণার সাথে এসব কিছু আইসিডিডিআরবিতে সর্বদা চলমান।

অথচ, এটা সবাইকে মানতে হবে যে, প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার (চিকিৎসক, অণুজীব বিজ্ঞানী, প্রাণরসায়নবিদ, জীববিজ্ঞানী, পরিসংখ্যানবিদ ইত্যাদি) বিশেষজ্ঞদের  সমন্বয়ে গবেষণার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র তৈরি হয়। ওরস্যালাইন (Oral Cholera Saline) আবিষ্কারের বিশাল অর্জনের কারনে বাংলাদেশের আপামর জনতা থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী ও সুশীল সমাজসহ রাজনীতিবিদ, এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তী ক্ষমতাসীন সব সরকার আইসিডিডিআরবি’র সার্বিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দিয়ে আসছে।

যেহেতু এদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে আইসিডিডিআরবি’র মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, প্রতিষ্ঠানটি যে বিগত দীর্ঘ সময়ে দেশের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার সিকি ভাগও পূরণ করতে পারেনি তা কেউ সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। বর্তমানে আইসিডিডিআর’বি মুষ্টিমেয় কয়েকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আগেও লিখেছি, আসলে আইসিডিডিআরবি’র সকল মৌলিক গবেষণা কার্যক্রম বন্ধের পর্যায়ে। প্রকৃতপক্ষে বিদেশীদের জন্য নমুনা সংগ্রহ করার কাজে আইসিডিডিআর’বিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সব জেনেও সরকারের সংশিষ্ট বিভাগগুলো নির্বিকার। অথচ, বাংলাদেশের জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পরিসংখানবিদ্যাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে অধ্যায়নরত প্রথম সারির সবার রোল মডেল, আইসিডিডিআরবি। দুই-একজন ভাগ্যবান ছাড়া আইসিডিডিআরবিতে চাকুরী করতে আসা প্রায় সকলের উপলব্ধি একই রকম। বঞ্চনা আর বৈষম্যের কষাঘাতে হতোদ্যম মানুষগুলো আজ দিশেহারা।

আগামী পর্বে জানবো আইসিডিডিআরবি ও পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের অবস্থা।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, মাইক্রো-বায়োলজি বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


নতুন কাগজ | সাজেদা হক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন