Natun Kagoj

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৭শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করছে

আপডেট: ১৫ নভে ২০১৬ | ১৩:৩৭

download-4ধীরাজ কুমার নাথ : অর্পিত সম্পতি প্রত্যর্পণ আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনালে অসংখ্য মামলা, দিনের পর দিন হাজিরা ইত্যাদি সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করছেন। সরকারের একটি কল্যাণধর্মী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ কীভাবে সমাজ জীবনে বিব্রতকর পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে, এ আইন হচ্ছে তারই অন্যতম উদাহরণ। যতই দিন যাচ্ছে, মনে হচ্ছে এ আইন ও তার প্রয়োগ সমস্যাসংকুল হয়ে উদ্ভাসিত হচ্ছে। কীভাবে এ আইনের প্রয়োগ অর্থবহ করা যায়, এ নিয়ে সরকার ও সুশীল সমাজকে মনোযোগী হতে হবে।

সপ্তমবারের মতো অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংশোধনী মন্ত্রিপরিষদে ২৪ অক্টোবর, ২০১৬ উপস্থাপন করা হলে কয়েকজন মন্ত্রী প্রশ্ন করেন, এই সংশোধনী কার স্বার্থে হচ্ছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আলোচ্যসূচি থেকে এই এজেন্ডা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। শোনা যায় একজন মন্ত্রী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও সহকারী কমিশনারদের ঘুষ খাওয়ার জন্য পথ তৈরি করতে এমনটি সংশোধনী আনা হয়েছে। ইতিপূর্বেও এ আইনের ছয়বার সংশোধনী আনা হয়েছিল কিন্তু জটিলতা শুধু বেড়েছে, সমস্যার লাঘব হয়নি আদৌ।

মন্ত্রিপরিষদের ক্ষোভের প্রধান কারণ হচ্ছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর অর্পিত সম্পত্তি বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছে প্রত্যর্পণের একটি আইন প্রণয়ন করে ২০১১ সালে। কিন্তু এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পরিবর্তে জটিলতা বেড়েছে এবং সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুর্নীতির এক অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হতে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিপরিষদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত ও প্রশংসনীয়।

প্রসঙ্গক্রমে এই আইনের অতীত কাহিনি নিয়ে সামান্য আলোকপাত করা যেতে পারে যাতে আইনের উদ্দেশ্য ও গভীরতা নিয়ে সংশয় অনুধাবন করা যায়। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ দিন অবধি, যার পরিসমাপ্তি হয়েছিল তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আয়ুব খান যুদ্ধের পর পরই পাকিস্তান প্রতিরা অধ্যাদেশ এবং পাকিস্তান প্রতিরা বিধি জারি করেন। তদানীন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের কতিপয় অতিশয় বুদ্ধিমান কর্মকর্তাদের পরামর্শে এবং ভূমি প্রশাসনের কর্মচারীদের প্ররোচনায় পাকিস্তান থেকে দেশত্যাগ করা সংখ্যালঘুদের জায়গা সম্পত্তিগুলোকে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে রাতারাতি ইজারা নিয়ে দখল করে ফেলে। এই আইনের সুবিধাভোগী ও দখলকারীরা মূলত বেশির ভাগ সরকারি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং কাননুনগো, তহশিলদার ইত্যাদি। তবে রাজনৈতিক কর্মীরাও বিভিন্ন সময়ে বন্ধুভাবে, আবার কখনো সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এসব সম্পত্তির মালিক বনে যায়। অবশ্য এভাবেই এ দেশে ভূমিদস্যুদের উত্থান ঘটে। সংেেপ বলা যায়, এই কালাকানুন পাকিস্তানে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের জীবনে এক অন্ধকার যুগের সূচনা করে, যা ৫০ বছর ধরে সমান তেজে ও তৎপরতায় বহাল আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন, এ অঙ্গনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি, পান্তরে বিভেদ এবং হিংসাকে দীর্ঘায়িত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। শুধু শত্রু সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে নামকরণ করেছে।

ড. আবুল বারকাতের গবেষণালব্ধ প্রকাশনা, ‘বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের অবিরাম বঞ্চনার কাহিনি’ (উবঢ়ৎরাধঃরড়হ ড়ভ ঐরহফঁ গরহড়ৎরঃু : ধ ংঃড়ৎু ড়ভ ঢ়বৎঢ়বঃঁধষ ফরংপৎরসরহধঃরড়হ)-এর মধ্যে উল্লেখ আছে ১৯৬৫ থেকে ২০০৬ সাল অবধি ১২ লাখ সংখ্যালঘু গৃহস্থালি পরিবার এবং ৬০ লাখ লোক শত্রু/অর্পিত সম্পত্তি আইনের মাধ্যমে সরাসরিভাবে তিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা ২৬ লাখ একর জমি হারিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই কালাকানুন একটি অবিরাম বঞ্চনার কাহিনি, যা সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা হলো এ জনপদের ঐতিহাসিক ভাবধারার পরিপন্থী।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে মতায় আসার পর এই আইন সংশোধন করে সংখ্যালঘুদের ওয়ারিশরা, যারা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছে তাদের সম্পত্তি ফেরতদানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু এ মহাপ্রকল্প মনোযোগের অভাবে ২০০১ সাল অবধি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে মতায় এসে সংখ্যালঘুদের দাবির মুখে ফের বিষয়টি বিবেচনায় আনে আওয়ামী লীগ। তবে চার বছর সময় লাগে এ কাজ শুরু করতে। অবশেষে সরকার অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০১১ সালে জারি করে। এ আইনে ‘ক’ ও ‘খ’ তফশিল তৈরি করা হয় এবং অর্পিত সম্পত্তি সুরাহা করার জন্য প্রতিটি জেলায় তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরই মধ্যে ৬ লাখের বেশি মামলা হয়েছে এসব ট্রাইব্যুনালে, কিন্তু নিষ্পত্তির সংখ্যা ১ শতাংশের কম।

অবশেষে ২০১৩ সালে গণদাবির মুখে ‘খ’ তালিকা বাতিল করা হয় । তবে ২০১২ সালে দুবার এবং ২০১৩ সালে দুবার সংশোধনী আনা হয়।

এবার সপ্তম সংশোধনী আনার উদ্দেশ্য ছিল অনেক ভয়াবহ এবং বিষয়টিকে আরা জটিল করার শামিল ও বাংলাদেশি দাবিদারকে চিরতরে বঞ্চিত করার সূক্ষ্ম কারচুপি। শোনা যায়, সংশোধনী প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে অর্পিত সম্পত্তি আইনের ১৮ (ক) ধারায় সংশোধনীতে লিমিটেশন অ্যাক্টের সেকশন-৫ প্রযোজ্য হবে না বলে প্রস্তাব করা হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে মামলার আপিল চলবে বছরের পর বছর ধরে। এ ছাড়া দেওয়ানি আইনের মতো ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে অর্থাৎ আবেদনকারী নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সরকারের নির্দেশনা প্রদানের ক্ষমতার নামে একটি উপধারা (২৯ ক) সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে যাতে বলা হয়েছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইন কিংবা আইনের মর্যাদাসম্পন্ন দলিলে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে রেকর্ড সংশোধনসহ ভূমির মালিকানা, নামজারি, নামজারি-সংক্রান্ত নথি বা আবেদন সম্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ অথবা ভূমি জরিপের যে কোনো পর্যায়ে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্দেশনা প্রদান করিতে পারিবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন ব্যতিরেকে উহা প্রতিপালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।’ এ ছাড়া বিশেষ আপিল নামে ১৮ ক ধারায় একটি সংশোধনীরর প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে নতুন সংশোধনী কার্যকরের ৯০ দিনের মধ্যে আপিল করার সময়ের কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, হাইকোর্টের এক রায়ে ১৯৭৪ সালে শত্রু সম্পত্তি আইনের অবসান হয়েছে। ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চের রায়ে বলা হয়েছে যে, এই সময়ের পর নতুন করে কোনো সম্পদকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তফসিলভুক্ত করা যাবে না। ভুক্তভোগীরা আশা করেছিল ১৯৭৪ সালের রায় মেনে অর্পিত সম্পত্তি-সংক্রান্ত জটিলতার অবসান হবে।

কিন্তু বর্তমান সরকার ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন অর্পিত সম্পত্তি নামে একটি ‘খ’ তফসিল সৃষ্টি করে যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে নতুন নতুন সম্পত্তিও অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় যুক্ত হয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি ও নতুনভাবে বিবাদের সূচনা করেছিল। তালিকা দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকের মতে, এ নতুন তফসিল একদিকে যেমন বে-আইনি এবং অন্যদিকে সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ, যা বিভেদের সূত্রপাত করেছে নতুনভাবে। তবে সরকার ২০১৩ সালে ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমি ফেরত দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না, এখানেই হচ্ছে বড় ধরনের সমস্যা।

অনেকে মনে করেন, সরকার একটি দুর্বল আইন প্রণয়ন করেছে ইচ্ছাকৃতভাবে, তহশিলদারদের প্ররোচনায় বা প্রভাবে। কর্তাব্যক্তিরা বুঝতেই পারেননি কোনটির অর্থ কী বা এর ফলে কী হতে পারে। তাদের অজ্ঞতার সুযোগে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ভুক্তভোগীদের অধিকার হরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেকের বদ্ধমূল ধারণা, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ বিষয়ে আদালতের রায় অনুযায়ী এখনি বিহিত করা না হলে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবল দূর করা সহজ হবে না।

প্রধানত বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে তিনটি। নতুন করে কোনো সম্পতি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না এবং যাদের পৈতৃক জায়গা-জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তারা যেন সুযোগ পান সেই তালিকা থেকে তাদের সম্পত্তি অবমুক্ত করতে। দ্বিতীয়ত, ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমি ফেরত দেওয়ার পর তার মিউটেশন বা খারিজ করতে হবে সঠিক মালিকের নামে এবং তা কীভাবে হবে ও এ ব্যাপারে ক্ষমতা কার চিহ্নিত করতে হবে। তৃতীয়ত, এসব ব্যাপারে স্থায়ী সমাধান করার লক্ষ্যে দুজন জেলা জজকে নিয়ে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের মতো প্রিয় হচ্ছে ‘ভূমি’। অথচ এ বাংলাদেশে কোনো সরকার ভূমি সংস্কার বা মালিকানা নির্ধারণের েেত্র দুর্নীতি পরিহারের মাধ্যমে ব্যাপক সংস্কার সাধনে মনোনিবেশ করেনি। কারণ তাদের অনেকেই হচ্ছে সুবিধাভোগী এবং উকিল বা মোক্তার শ্রেণির লোকজন। এ জাতীয় মামলা না থাকলে তাদের আয়-রোজগার চলবে না বা তারা নিজেরাও মাতবরি করতে পারবে না।

সপ্তম সংশোধনীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর কী জাতীয় ভয়াবহ সংশোধনী নিয়ে আবার সংশ্লিষ্টরা অগ্রসর হবেন, তা বুঝে ওঠা সহজ হবে না। তবে সরকারকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, ১৯৬৫ সালের মতো আরও অধিক বঞ্চনার সূত্র আবিষ্কার করে ভূমিদস্যুরা যেন অগ্রসর হতে না পারে।

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের সঠিক প্রয়োগের পথে সব অন্তরায় ও সমস্যার সমাধান অত্যন্ত জরুরি। এমন সমস্যা জাতীয় সংহতি ও সহমর্মিতার পথে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিরাজ করছে। রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে অগ্রগতির পথে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।

লেখক : সাবেক সচিব


নতুন কাগজ | অনিল সেন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Loading Facebook Comments ...
 বিজ্ঞাপন